কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও রেডিও:
চ্যানেল থেকে কথোপকথনে - বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট
বিশ্বের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী ও জনপ্রিয় গণমাধ্যম রেডিওকে নতুনভাবে রূপ দিচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)। পরিবর্তনটা শুধু “পর্দার আড়ালে” উৎপাদন-কৌশলে সীমাবদ্ধ নয়; শ্রোতারা কীভাবে শোনেন, কী চান, কীভাবে খুঁজে নেন, এমনকি কীভাবে প্রশ্ন করেন, সেই অভ্যাসেও বড় ধাক্কা লাগছে। আগে রেডিও ছিল মূলত “চ্যানেল-চালিত” মাধ্যম: স্টেশন ঠিক করে দিত কখন কোন অনুষ্ঠান, শ্রোতা শুনত। এখন ধীরে ধীরে সেটি “কথোপকথন-চালিত” অভিজ্ঞতায় রূপ নিচ্ছে: শ্রোতা প্রশ্ন করবে, অনুরোধ করবে, নিজের পছন্দমতো বিষয় টেনে আনবে, এবং তাৎক্ষণিকভাবে উত্তর বা কনটেন্ট পাবে।
রেডিওর পর্দার আড়ালে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা: উৎপাদন দ্রুত, খরচ কম, নতুন সম্ভাবনা
রেডিও শিল্পজুড়ে কনটেন্ট তৈরিতে AI-এর প্রভাব ইতোমধ্যেই স্পষ্ট। ধারণা থেকে উৎপাদন পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়া দ্রুত হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান একাধিক ধাপে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করছে, যেমন:
• আইডিয়া তৈরি ও স্ক্রিপ্টিং: বিষয় নির্বাচন, শিরোনাম, প্রশ্নমালা, স্টোরি কাঠামো সাজানো।
• এডিটিং ও পোস্ট-প্রসেসিং: অডিও পরিষ্কার করা, নয়েজ কমানো, সেগমেন্ট কাটা, ইন্ট্রো/আউট্রো বানানো।
• ট্রান্সক্রিপশন ও আর্কাইভিং: অনুষ্ঠানের কথাকে লেখায় রূপান্তর, পরে খুঁজে পাওয়ার জন্য সংরক্ষণ।
• মেটাডাটা (তথ্য-ট্যাগ) তৈরি: অনুষ্ঠান কোন বিষয়, কোন এলাকা, কোন অতিথি, কোন সময়ের প্রসঙ্গ ইত্যাদি ট্যাগ করা।
বাংলাদেশে এই সুবিধার বাস্তব মূল্য খুব বেশি, কারণ অনেক স্টেশনেই জনবল সীমিত, প্রশিক্ষিত অডিও এডিটর কম, এবং সময়ের চাপ বেশি। AI এখানে সহায়ক “এনাবলার” হতে পারে, যদি মানব সম্পাদনা (human editorial control) বজায় থাকে।
সামনে যে রূপান্তর: সহায়কও, ব্যাঘাত-সৃষ্টিকারীও
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা একদিকে অসাধারণ সহায়ক। আবার এটিও স্বীকার করতে হবে, এটি ব্যাঘাত সৃষ্টিকারী শক্তি হতে পারে। কারণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শুধু কাজ দ্রুত করছে না; এটি বদলে দিচ্ছে “সংযোগের ধরন”। প্রযোজক কীভাবে শ্রোতার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করেন, এবং শ্রোতা কীভাবে কনটেন্টের সঙ্গে যুক্ত হন, সেই সম্পর্কটাই পুনর্গঠিত হচ্ছে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভুল বোঝাবুঝি আছে: এই পরিবর্তনের মানে “লাইভ” বা “লিনিয়ার” (সময়-ধারাবাহিক) রেডিও শেষ হয়ে যাচ্ছে না। বাংলাদেশে লাইভ রেডিও এখনও শক্তিশালী, বিশেষত:
• দুর্যোগ ও জরুরি তথ্য (ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিধস, অগ্নিকাণ্ড)
• বিদ্যুৎ বা মোবাইল নেটওয়ার্কে বিঘ্ন
• স্থানীয় খবর ও কমিউনিটি-জীবন (গ্রাম/উপজেলা পর্যায়ের তথ্য, বাজারদর, স্বাস্থ্য-পরামর্শ)
সাম্প্রতিক বছরগুলোর দুর্যোগ অভিজ্ঞতা আমাদের বারবার দেখিয়েছে: মোবাইল নেটওয়ার্ক ভেঙে পড়লে বা ইন্টারনেট ধীর/অকার্যকর হলে সম্প্রচার রেডিও অনেক সময় শেষ ভরসা হয়ে দাঁড়ায়। সহজলভ্য, কম খরচে চলা, এবং মানুষের আস্থাভিত্তিক এই মাধ্যম আধুনিক জীবনেও নির্ভরযোগ্য সঙ্গী। তবে বদলাবে “শ্রোতার সাথে যোগাযোগের ভাষা ও কাঠামো”।
শ্রোতারা এখন “অ্যাক্টিভ”: প্রশ্ন করবে, ঠিক করে নেবে, নিজের মতো শুনবে
ভয়েস-ভিত্তিক ডিজিটাল সহকারী এবং বড় ভাষা মডেল (LLM) এখন মানুষের স্বাভাবিক ভাষা বোঝে, প্রাসঙ্গিক উত্তর দেয়, এবং কথোপকথনের মতো প্রতিক্রিয়া দেখায়। আগের ভয়েস প্রযুক্তি ছিল কমান্ড-কেন্দ্রিক: “এইটা চালাও”, “ওটা থামাও”। এখন সেটি সংলাপ-কেন্দ্রিক:
• “আজ আমার এলাকার বন্যা পরিস্থিতি কী?”
• “গর্ভবতী মায়েদের জন্য কী সতর্কতা আছে?”
• “স্থানীয় হাসপাতালে ডেঙ্গু টেস্ট কোথায় হচ্ছে?”
• “আমার সন্তানের পরীক্ষার চাপ কমাতে কী করবো?”
বাংলাদেশে সংযুক্ত গাড়ির উদাহরণ পাশ্চাত্য দেশের মতো ব্যাপক না হলেও, স্মার্টফোন, ব্লুটুথ হেডসেট, স্মার্ট টিভি, এবং ক্রমশ স্মার্ট স্পিকার বা ইন-কার অডিও সিস্টেমের ব্যবহার বাড়ছে। এই বাস্তবতায় কথোপকথনমূলক ইন্টারফেস শ্রোতাকে “লিন ফরওয়ার্ড” করতে দেবে: তারা আর শুধু স্টেশন যা দিচ্ছে তা নিষ্ক্রিয়ভাবে নেবে না; বরং নিজের পরিস্থিতি, সময়, রুচি ও প্রয়োজন অনুযায়ী কনটেন্ট টেনে আনবে।
চ্যানেল-কেন্দ্রিক থেকে কনটেন্ট-কেন্দ্রিক: ব্র্যান্ডের নতুন যুদ্ধ
আগে “স্টেশন” ছিল মূল দরজা। এখন মানুষ অনেক সময় স্টেশনে ঢোকার আগেই নির্দিষ্ট কনটেন্ট খুঁজবে:
• “এই সপ্তাহে কৃষকের জন্য কী পরামর্শ?”
• “মাইগ্রেশন/প্রবাস জীবন নিয়ে কোন অনুষ্ঠান?”
• “নারীর ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে কোন আলোচনা?”
এতে শ্রোতার জন্য সুবিধা বাড়ে: দ্রুত খুঁজে পাওয়া, নিজের মতো শোনা, নতুন বিষয় আবিষ্কার। কিন্তু স্টেশনগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি হয়: ব্র্যান্ড-লয়্যালটি ও পরিচিতি ধরে রাখা কঠিন হবে, কারণ শ্রোতা কনটেন্ট কোথা থেকে পেল সেটাই ভুলে যেতে পারে। তাই “উৎস-স্বীকৃতি” (attribution) এখন কৌশলগত ইস্যু:
• কনটেন্টের শুরু/শেষে পরিষ্কার স্টেশন পরিচয়
• শিরোনাম, বর্ণনা, ট্যাগে স্টেশন নাম
• যে প্ল্যাটফর্মেই কনটেন্ট শোনা হোক, সেখানে স্টেশনের পরিচয় দৃশ্যমান/শ্রব্যমান রাখা
আরেকটি বাস্তব সমস্যা হলো ডেটা ও সুপারিশ: প্ল্যাটফর্ম বা ডিভাইস নির্মাতা কনটেন্ট থেকে ডেটা পয়েন্ট বানাতে চাইবে, কিন্তু তাতে প্রযোজকের তাৎক্ষণিক লাভ সবসময় স্পষ্ট নয়। এখানে দরকষাকষি দরকার: কার ডেটা, কার নিয়ন্ত্রণ, কার লাভ।
“এবার কেন ভিন্ন হতে পারে”: পাঁচটি সমাপতিত কারণ
এবার রূপান্তর গভীর হতে পারে, কারণ কয়েকটি কারণ একসাথে মিলছে:
• উন্নত কথোপকথন সক্ষমতা: LLM-ভিত্তিক সিস্টেম কাঠামোবদ্ধ কমান্ড নয়, বাস্তব সংলাপ বোঝে।
• ভোগের অভ্যাস বদল: ছোট কনটেন্ট, ক্লিপ, হাইলাইট জনপ্রিয়; AI-চালিত আবিষ্কারের সঙ্গে মানানসই।
• সমৃদ্ধ মেটাডাটা: ভালো ট্যাগিং থাকলে AI সুপারিশ আরও নির্ভুল হয়।
• প্ল্যাটফর্মের ক্ষমতা বৃদ্ধি: ডিভাইস/অ্যাপ নির্মাতারা কনটেন্ট যাত্রায় আরও নিয়ন্ত্রণ চাইবে।
• ব্যবহারকারীর প্রত্যাশা: মানুষ এখন নির্বিঘ্ন, বুদ্ধিদীপ্ত ইন্টারঅ্যাকশন চায়; “খুঁজে” নয়, “জিজ্ঞেস করে” পেতে চায়।
বাংলাদেশের বিশেষ চ্যালেঞ্জ: ভুল তথ্য, ভাষাগত বৈষম্য, গোপনীয়তা
বাংলাদেশে AI-র সুবিধার পাশাপাশি কিছু ঝুঁকি খুব বাস্তব:
• ভুল তথ্য ও ডিপফেক: সংকটকালে গুজব দ্রুত ছড়ায়; AI তা আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলতে পারে।
• ভাষা ও উচ্চারণ বৈষম্য: বাংলা ভাষার আঞ্চলিক উচ্চারণ, উপভাষা, সংখ্যালঘু ভাষা ঠিকমতো না বুঝলে “কথোপকথন” একপাক্ষিক হয়ে যাবে।
• গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা: শ্রোতার প্রশ্নে ব্যক্তিগত তথ্য থাকতে পারে (স্বাস্থ্য, পরিবার, সহিংসতা, আইনি সমস্যা)। ডেটা কোথায় যাচ্ছে, কে রাখছে, কতদিন রাখছে, স্পষ্ট না হলে আস্থা নষ্ট হবে।
• সম্পাদকীয় দায়িত্ব: AI দ্রুত কনটেন্ট তৈরি করলেও সত্যতা, ন্যায্যতা, প্রেক্ষাপট, এবং ক্ষতির ঝুঁকি মূল্যায়নের দায় মানুষেরই।
এখানে একটি কড়া কথা বলা দরকার: “কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা থাকলেই রেডিও আধুনিক” এমন ধারণা বিপজ্জনক। প্রযুক্তি যোগ করলেই মান বাড়ে না; বরং ভুলভাবে যোগ করলে আস্থা কমে, বিভ্রান্তি বাড়ে, এবং সংবাদ-নির্ভরতার ক্ষতি হয়।
সম্প্রচারকদের করণীয়: এখনই পাঁচটি প্রস্তুতি
সফল হতে হলে আগেভাগে সক্রিয় প্রস্তুতি দরকার। বাস্তবসম্মত কয়েকটি দিকনির্দেশনা:
• মেটাডাটা সংস্কৃতি গড়ুন: প্রতিটি অনুষ্ঠানকে বিষয়, এলাকা, লক্ষ্য শ্রোতা, ভাষা/উপভাষা, সময়-প্রাসঙ্গিকতা দিয়ে ট্যাগ করুন।
• উৎস-স্বীকৃতি নিশ্চিত করুন: কনটেন্ট যেখানে শোনা হবে, সেখানেই স্টেশনের পরিচয় দৃশ্যমান/শ্রব্যমান রাখুন।
• হাইব্রিড বিতরণ কৌশল: FM/AM-এর সাথে অনলাইন ক্লিপ, পডকাস্ট, ইউটিউব/ফেসবুক অডিও, মেসেজিং-ভিত্তিক লিংক শেয়ারিং সমন্বিত করুন।
• মানব-সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণ: সংবাদ, স্বাস্থ্য, আইন, দুর্যোগ তথ্যের ক্ষেত্রে “human-in-the-loop” বাধ্যতামূলক রাখুন।
• ডেটা ও নীতিমালা: শ্রোতার ডেটা, কনসেন্ট, সংরক্ষণকাল, এবং তৃতীয় পক্ষের অ্যাক্সেস নিয়ে স্পষ্ট নীতিমালা দিন।
এই দুই লক্ষ্য (মেটাডাটা + অ্যাট্রিবিউশন) প্রযুক্তি-প্রদানকারীদের সঙ্গে সহযোগিতার ওপর নির্ভরশীল। তবে সহযোগিতা মানে নির্ভরশীলতা নয়। দরকার “শর্তসাপেক্ষ অংশীদারত্ব”: স্বচ্ছতা, ডেটা সুরক্ষা, এবং সম্পাদকীয় স্বাধীনতা অক্ষুণ্ন রেখে।
আন্তর্জাতিক দিকনির্দেশনা: সম্প্রচারের ভবিষ্যৎ নিয়ে কাজ চলছে
আন্তর্জাতিক পরিসরে সম্প্রচারে AI ব্যবহারের সম্ভাবনা, গুণগত মান মূল্যায়ন, কনটেন্ট সমাবেশ, এবং ট্রান্সমিশন দক্ষতা উন্নত করার নানা উদ্যোগ নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনা চলছে। এসব আলোচনা থেকে তৈরি হওয়া ব্যবহারক্ষেত্র (use cases), প্রযুক্তিগত পরিপক্বতা মূল্যায়ন, এবং আন্তর্জাতিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ দিকনির্দেশনা সম্প্রচারকদেরকে আরও দায়িত্বশীলভাবে AI ব্যবহার করতে সহায়তা করতে পারে। বাংলাদেশে এর মানে হলো: “শুধু ট্রেন্ড ফলো” নয়, মান-নীতিভিত্তিক গ্রহণ।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রেডিওর বিস্তার, প্রবেশগম্যতা এবং প্রাসঙ্গিকতা বাড়ানোর অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করে। তবে রেডিওকে শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে টিকিয়ে রেখেছে যে মৌলিক শক্তিগুলো, সেগুলো আজও সমান গুরুত্বপূর্ণ: তাৎক্ষণিকতা, অন্তরঙ্গতা, স্থানীয়তা, এবং আস্থা।
প্রশ্নটা এই নয় যে- কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা রেডিওকে বদলাবে কি না। প্রশ্নটা হলো: আমরা কি এই বদলকে আস্থা, জনস্বার্থ, সত্যতা ও অন্তর্ভুক্তির দিকে চালাতে পারবো, নাকি প্ল্যাটফর্ম-নিয়ন্ত্রিত, অস্বচ্ছ ও গুজব-ঝুঁকিপূর্ণ এক অভ্যাসে ঢুকে পড়বো? চিন্তাশীল ও কৌশলগতভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গ্রহণ করলে, সম্প্রচার রেডিও আগামী প্রজন্মের জন্যও মানুষকে জানাতে, বিনোদন দিতে এবং কমিউনিটিকে সংযুক্ত রাখতে পারবে।
লেখেকঃ বিশ্ব বেতার দিবস উদযাপন আন্তর্জাতিক কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য (২০১২ সাল থেকে), প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, বাংলাদেশ এনজিও নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি) এবং বাংলাদেশের জন্য দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক অ্যাম্বাসাডর।







