অনলাইন বিজ্ঞাপন দিয়ে স্পাইওয়্যার ছড়ানোর কৌশল উন্মোচন

ইসরায়েলি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে 'জিরো-ক্লিক' হ্যাকিং প্রযুক্তি

  • বিজ্ঞাপনভিত্তিক 'অ্যাডফেকশন' কৌশলে ব্যবহারকারীর অজান্তে ডিভাইসে স্পাইওয়্যার ইনস্টল হচ্ছে
  • কাতারের আল জাজিরার ৪৫টি ডিভাইসে ক্যাণ্ডিরু স্পাইওয়্যার হামলার প্রমাণ মিলেছে
  • জাতিসংঘ, নেটো ও এনভিডিয়াসহ আন্তর্জাতিক সংস্থার নেটওয়ার্কে ঝুঁকিপূর্ণ বিজ্ঞাপন শনাক্ত হয়েছে

ইসরায়েলি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে 'জিরো-ক্লিক' হ্যাকিং প্রযুক্তি
১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ০৯:৫৩  

অনলাইন বিজ্ঞাপনী ব্যবস্থার সুযোগ নিয়ে লক্ষ্যবস্তু করা ব্যক্তিদের ডিভাইসে লুকিয়ে ক্ষতিকর স্পাইওয়্যার ছড়ানোর এক নতুন ও মারাত্মক কৌশল 'অ্যাডফেকশন' (AdFection) উন্মোচন করেছেন সাইবার গবেষকরা। কানাডার ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোভিত্তিক সাইবার নিরাপত্তা গবেষণা কেন্দ্র ‘সিটিজেন ল্যাব’-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ চাঞ্চল্যকর তথ্য। ইসরায়েলভিত্তিক ডিজিটাল বিজ্ঞাপনী সংস্থা ‘ডিসকভার-টেক’ (Discover-Tech)-এর তৈরি প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কাছে এসব ঝুঁকিপূর্ণ অনলাইন বিজ্ঞাপন দেখানো হচ্ছে।

সিটিজেন ল্যাবের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ডিসকভার-টেকের পরিচালিত বিজ্ঞাপনী নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাতারভিত্তিক আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরার অন্তত ৪৫টি ডিভাইসে গোপনে নজরদারি সফটওয়্যার পাঠানো হয়েছে। সংবাদমাধ্যমটি তাদের নেটওয়ার্ক লগ শেয়ার করার পর এ অনুপ্রবেশের সত্যতা ধরা পড়ে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘কন্ট্রোলিয়াম’ (Controlium) নামে একটি ড্যাশবোর্ড বা সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম পরিচালনা করে ডিসকভার-টেক। এ প্ল্যাটফর্মের সাহায্যে সাধারণ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীদের অনলাইন গতিবিধির ওপর নজরদারি চালিয়ে তাদের পরিচয় ডি-অ্যানোনিমাস করা হয়। পরবর্তীতে ইসরায়েলি মার্সেনারি স্পাইওয়্যার নির্মাতা ‘ক্যান্ডিরু’ (Candiru)-র মতো তৃতীয় পক্ষের ক্ষতিকর কোড ব্যবহারকারীর নির্দিষ্ট ডিভাইসে পৌঁছে দেওয়া হয়। এই 'জিরো-ক্লিক' (Zero-click) হ্যাকিং পদ্ধতিতে ভুক্তভোগীকে কোনো ক্ষতিকর লিংক বা ফাইলে ক্লিক করতে হয় না। সাইট বা অ্যাপে বিজ্ঞাপন প্রদর্শিত হওয়ার মাত্র কয়েক মিলি-সেকেন্ডের মধ্যে স্বয়ংক্রিয়ভাবে স্পাইওয়্যারটি ইনস্টল হয়ে যায়।

সিটিজেন ল্যাব জানিয়েছে, অনলাইন বিজ্ঞাপনের বড় বাজারকে বিশ্বজুড়ে নীরব ঘাতক হ্যাকিংয়ের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। গেইম বা বিভিন্ন মোবাইল অ্যাপে ছদ্মবেশী বিজ্ঞাপনের আড়ালে ব্যবহারকারীর আইপি অ্যাড্রেস ও পরিচয় হাতিয়ে নেয় এই সিস্টেম। ২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের মধ্যে ইয়েমেন, ব্রাজিল, মেক্সিকো, চেক প্রজাতন্ত্রসহ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ডিভাইসে এসব বিজ্ঞাপন রেন্ডার হয়েছে।

আলাদা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কনফিয়্যান্ট’ (Confiant)-এর তথ্যানুযায়ী, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন সরকারি সংস্থা ছাড়াও জাতিসংঘ (UN), নেটো (NATO), আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (ICC) এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) মতো সংবেদনশীল সংস্থার সংকেতযুক্ত নেটওয়ার্কেও এই বিজ্ঞাপনগুলো পৌঁছাতে সক্ষম হয়েছে। এছাড়া সেমিকন্ডাক্টর জায়ান্ট এনভিডিয়া (Nvidia), সানডিস্ক ও ব্রডকমের মতো প্রতিষ্ঠানের নেটওয়ার্কেও এ ধরনের বিজ্ঞাপন দেখা গেছে। ক্যাসপারস্কি বা গুগলের মতো প্রযুক্তি সংস্থাগুলো বিষয়টি শনাক্ত করার পর গুগল এবং ইসকিমি (Eskimi)-সহ প্রধান নেটওয়ার্কগুলো ডিসকভার-টেকের অ্যাকাউন্ট ও প্ল্যাটফর্ম এক্সেস ব্লক করে দিয়েছে।

সিটিজেন ল্যাবের জ্যেষ্ঠ গবেষক বিল মারজাক জানান, এতদিন অনলাইন বিজ্ঞাপন দিয়ে লক্ষ্যবস্তু চিনে স্বয়ংক্রিয় হ্যাকিং চালানোর গুঞ্জন থাকলেও এই প্রথম তাদের হাতে সুস্পষ্ট ও প্রযুক্তিগত প্রমাণ এসেছে। আরেক গবেষক উলফি ক্রিস্টল জানান, বর্তমান অনলাইন বিজ্ঞাপনের রিয়েল-টাইম বিডিং (RTB) প্রক্রিয়া রাষ্ট্র, ব্যক্তি খাত ও নাগরিকদের জন্য মারাত্মক নিরাপত্তা হুমকি। এটি নিয়ন্ত্রণে অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় সাইবার নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর হস্তক্ষেপ ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন। ডিসকভার-টেক বা ক্যান্ডিরুর মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান এ বিষয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।     //ডিবিটেক/সিটিজেনল্যাব/এসএমপি/এমআইএসটি//