দীর্ঘমেয়াদি মেন্টরিংয়ের মাধ্যমে নারী ডিজিটাল ফ্রিল্যান্সারদের এগিয়ে দেওয়ার আহ্বান

দীর্ঘমেয়াদি মেন্টরিংয়ের মাধ্যমে নারী ডিজিটাল ফ্রিল্যান্সারদের এগিয়ে দেওয়ার আহ্বান
১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ১০:২৫  

অংশগ্রহণের ধীরগতি, ডিজিটাল শ্রম আইনের অস্পষ্টতা, নিরাপদ পেমেন্ট ব্যবস্থার অভাব এবং পরিবার ও সামাজিক সচেতনতার ঘাটতির কারণে দেশে নারী ফ্রিল্যান্সারদের প্রত্যাশিত গতি ও দক্ষতা বাড়ছে না। ফ্রিল্যান্সারদের নিয়ে কাজ করেন এমন স্টেকহোল্ডারদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এক আলোচনায় বক্তারা এই অভিমত ব্যক্ত করেছেন। “বাংলাদেশে নারী ফ্রিল্যান্সারদের অবদান, অধিকার ও চ্যালেঞ্জ” শীর্ষক এক গবেষণার অংশ হিসেবে ১৭ ফেব্রুয়ারি ঢাকার ক্রিয়েটিভ আইটি ইনস্টিটিউটে যৌথভাবে এই আলোচনার আয়োজন করে বাইটস ফর অল বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ ওপেন সোর্স নেটওয়ার্ক (বিডিওএসএন)।

অংশগ্রহণকারীরা বলেন, এসব কাঠামোগত সমস্যা সমাধান না হলে নারী ফ্রিল্যান্সিং খাত প্রত্যাশিত গতিতে এগোবে না।

আলোচনায় ক্রিয়েটিভ বিজনেস গ্রুপের চেয়ারম্যান মনির হোসেন বলেন, “দেশে নারী ফ্রিল্যান্সারদের সংখ্যা ও সামর্থ্য যেভাবে বাড়া দরকার, সেভাবে বাড়ছে না। এ জন্য সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাত এবং মিডিয়াকে আরও উদ্যোগী ভূমিকা নিতে হবে।” তিনি মনে করেন, প্রশিক্ষণ, বাজারসংযোগ ও দৃশ্যমান রোল মডেলএই তিন বিষয়ে সমন্বিতভাবে এগোতে না পারলে নারী অংশগ্রহণ বাড়ানো কঠিন হবে।

ডিজিটালি রাইট–এর হেড অব রিসার্চ আবদুল্লাহ তিতির বলেন, “আমাদের দেশের বিদ্যমান শ্রম আইনে ডিজিটাল ফ্রিল্যান্সারদের অধিকার ও সুরক্ষা বিষয়ক কোনো সুস্পষ্ট কাঠামো নেই। যারা দেশীয় ক্লায়েন্টদের জন্য কাজ করেন, তাদের বেশিরভাগই ফেসবুকের মতো প্ল্যাটফর্মে যোগাযোগের মাধ্যমে কাজ নেন। ফলে কর্মীরা আইনি সুরক্ষা ও প্রতিকার পান না। অনেকেই কাজ করার পর প্রাপ্য মজুরি থেকেও বঞ্চিত হন।” তিনি শ্রম সুরক্ষা ও বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যকর কাঠামো প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

নারী উদ্যোক্তা ও গ্রাফিক ডিজাইনার এমরাজিনা ইসলাম বলেন, “দেশীয় আইনের আওতায় কোনো মার্কেটপ্লেস এসক্রো করতে পারে না। ফলে অনেক বায়ার কাজ করিয়ে টাকা পরিশোধ না করে হাওয়া হয়ে যায়। কিন্তু যদি এসক্রো সিস্টেম থাকতো, তাহলে কাজ শুরুর আগেই মার্কেটপ্লেসে পারিশ্রমিক জমা রাখা যেত এবং সেক্ষেত্রে সহজে প্রতারণা করা যেত না।” তিনি জানান, আপওয়ার্কের মতো গ্লোবাল মার্কেটপ্লেসগুলোতে এসক্রো সুবিধা থাকায় সেখানে প্রতারণার সুযোগ খুবই কম। আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা মত দেন, নিরাপদ পেমেন্ট সিস্টেম ছাড়া নারী ফ্রিল্যান্সারদের জন্য টেকসই ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

আলোচনায় আরও উঠে আসে পরিবার ও সামাজিক মানসিকতার প্রভাব, মেন্টরশিপ ও স্ট্রাকচার্ড সাপোর্ট সিস্টেমের ঘাটতি, নারী-কেন্দ্রিক নিরাপদ প্রশিক্ষণ পরিবেশের প্রয়োজনীয়তা এবং ছোট কাজ (small gigs) থেকে উচ্চমূল্যের (high-value) প্রকল্পে নারীদের অগ্রগতির চ্যালেঞ্জ। অংশগ্রহণকারীদের মতে, নারী ফ্রিল্যান্সিং শুধু আয়ের সুযোগ নয়; এটি নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও সামাজিক অবস্থান পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।

বাংলাদেশে বর্তমানে আনুমানিক ৬.৫ লাখ সক্রিয় ফ্রিল্যান্সার রয়েছেন। বিভিন্ন শিল্পখাতের তথ্য অনুযায়ী, এর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নারী, যারা ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, UI/UX, কনটেন্ট ডেভেলপমেন্ট ও সফটওয়্যার সেবায় যুক্ত থেকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে অবদান রাখছেন। গবেষণা দল জানিয়েছে, অনলাইন সার্ভে ও দুই দফা FGD–র তথ্য বিশ্লেষণ করে নারী ডিজিটাল ফ্রিল্যান্সারদের জন্য একটি সুস্পষ্ট নীতিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সুপারিশমালা প্রণয়ন করা হবে।

আলোচনায় আরও অংশ নেন ক্রিয়েটিভ আইটি ইনস্টিটিউটের সিওও জিয়াউদ্দিন মাহমুদ ও এজিএম শাকিলুর রহমান, উইট ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী নাজিব রাফে, গ্রামীণফোন একাডেমির ইনস্ট্রাক্টর ইয়াসিন আহমেদ ও মুনতাসির হাসনাত, ডিকোড ল্যাবের ম্যানেজিং ডিরেক্টর আরিফ মইনুদ্দিন, টিম মাভিনের উদ্যোক্তা কাজী মামুন, প্রশিক্ষক রোকাইয়া হক, রিদাহ তামান্না, বিডিওএসএনের কোষাধ্যক্ষ প্রমি নাহজিদ ও গবেষণা সহযোগী লাবিবা বাশার, নারী ফ্রিল্যান্সার তানজিলা আক্তার এবং তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক লেখক রাহিতুল ইসলাম প্রমুখ।

চলমান গবেষণাটি তিন ধাপে পরিচালিত হচ্ছে। গত ৪ ফেব্রুয়ারি শুধু নারী ফ্রিল্যান্সারদের নিয়ে একটি আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পাশাপাশি দেশব্যাপী নারী ডিজিটাল ফ্রিল্যান্সারদের অভিজ্ঞতা ও মতামত সংগ্রহের জন্য একটি অনলাইন সার্ভে বর্তমানে চালু রয়েছে। গবেষণার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন বিশ্লেষণ শেষে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক, প্ল্যাটফর্ম ও স্টেকহোল্ডারদের কাছে সুপারিশ উপস্থাপন করা হবে।

আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন বিডিওএসএনের সভাপতি মুনির হাসান।

ডিবিটেক/এসএ/ইকে