ক্রিয়েটিভ ইকোনমি: বাংলাদেশের সফট পাওয়ার ও প্রবৃদ্ধির অব্যবহৃত অস্ত্র
বিশ্ব অর্থনীতি এখন প্রাকৃতিক সম্পদ থেকে সৃজনশীলতা ও মেধাস্বত্বভিত্তিক কাঠামোর দিকে ঝুঁকছে। চলচ্চিত্র, গেমিং, ডিজাইন ও এআই সেবার মতো উচ্চমূল্য খাতের বিশাল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশে এটি উপেক্ষিত। নিবন্ধটিতে আইনি সংস্কার, নীতিগত সমাধান এবং সঠিক প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে ক্রিয়েটিভ ইকোনমিকে জাতীয় প্রবৃদ্ধি ও সফট পাওয়ারের প্রধান হাতিয়ার করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশ্ব অর্থনীতি আজ প্রাকৃতিক সম্পদ ও প্রথাগত শ্রমনির্ভর কাঠামো থেকে জ্ঞান, সৃজনশীলতা এবং মেধাস্বত্বভিত্তিক (IP-based) অর্থনীতির দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। ফলে চলচ্চিত্র, সংগীত, অ্যানিমেশন, গেমিং, ডিজাইন, সফটওয়্যার, ডিজিটাল কনটেন্ট, হস্তশিল্প এবং এআই-ভিত্তিক সৃজনশীল সেবার মতো খাতগুলো আজ কেবল সংস্কৃতির অনুষঙ্গ নয়, বরং উচ্চমূল্য সংযোজনকারী অন্যতম শক্তিশালী অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক heritage, প্রযুক্তিতে দক্ষ বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী এবং বিকাশমান ডিজিটাল অর্থনীতির কারণে এই খাতে বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এটি এখনও আমাদের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনা ও সামষ্টিক অর্থনৈতিক কৌশলে প্রয়োজনীয় গুরুত্ব পায়নি।
বর্তমানে কার্যকর কপিরাইট ও রয়্যালটি ব্যবস্থার তীব্র অভাব, সর্বগ্রাসী ডিজিটাল পাইরেসি, অর্থায়নের চরম সীমাবদ্ধতা, প্রাতিষ্ঠানিক ও দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি, আন্তর্জাতিক বিপণনের দুর্বলতা এবং সুনির্দিষ্ট সমন্বিত নীতির অভাবে দেশের সৃজনশীল শিল্প তার পূর্ণ সম্ভাবনায় পৌঁছাতে পারছে না। সঠিক নীতি, আইনি সংস্কার এবং যুগোপযোগী প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে ক্রিয়েটিভ ইকোনমি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হতে পারে। একই সাথে এটি বৈশ্বিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের নিজস্ব ব্র্যান্ডিং ও 'সফট পাওয়ার' (Soft Power) শক্তিশালী করার সবচেয়ে মোক্ষম হাতিয়ার হতে পারে।
কৌশলগত রোডম্যাপ ও নীতিগত সমাধান
সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (CSER)-এর মতে, এই বিপুল সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সুনির্দিষ্ট কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে:
জাতীয় ক্রিয়েটিভ ইকোনমি পলিসি: প্রথমেই একটি যুগোপযোগী National Creative Economy Policy প্রণয়ন করে ক্রিয়েটিভ ইকোনমিকে একটি স্বতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক অর্থনৈতিক খাত হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিতে হবে।
আর্থিক ও পরিকাঠামো তহবিল: খাতের প্রাথমিক মূলধন সংকট দূর করতে একটি Creative Economy Development Fund গঠন, সমন্বিত ডিজিটাল রয়্যালটি অবকাঠামো নির্মাণ, বিভাগীয় পর্যায়ে 'Creative Hub' এবং জেলা পর্যায়ে 'Creative Cluster' গড়ে তোলা জরুরি।
মেধাস্বত্ব ও আন্তর্জাতিকায়ন: কঠোর আইনি প্রয়োগের মাধ্যমে মেধাস্বত্ব সুরক্ষা ও ডিজিটাল পাইরেসি প্রতিরোধ করতে হবে। সেই সাথে আন্তর্জাতিক বাজারে দেশীয় কনটেন্ট ছড়িয়ে দিতে Creative Export Promotion Programme এবং Creative Economy Satellite Account চালু করা প্রয়োজন।
শিক্ষায় রূপান্তর: আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় প্রথাগত সিলেবাসের বাইরে Creative Entrepreneurship, Design Thinking, Digital Media এবং IP Management-এর মতো সমসাময়িক বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করতে হবে এবং ২০৩০ সালকে লক্ষ্য রেখে একটি দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় রোডম্যাপ প্রণয়ন করতে হবে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ভারত, জাপান এবং বিশেষ করে দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশগুলো সুপরিকল্পিত রাষ্ট্রীয় নীতির মাধ্যমে তাদের culture ও সৃজনশীল শিল্পকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তিতে রূপান্তর করেছে। বাংলাদেশও আজ একই পথে এগোতে পারে, যদি আমরা সৃজনশীল শিল্পকে কেবল সংস্কৃতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ না রেখে জাতীয় শিল্পনীতি, শিক্ষা, তথ্যপ্রযুক্তি, বাণিজ্য ও রপ্তানি কৌশলের মূলধারার সঙ্গে সমন্বিত করতে পারি। শিল্পী, লেখক, ডিজাইনার, সফটওয়্যার নির্মাতা, গেম ডেভেলপার ও ডিজিটাল কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য একটি টেকসই ও সুরক্ষিত পরিবেশ সৃষ্টি করা গেলে বাংলাদেশ শুধু "Made in Bangladesh" নয়, বরং "Created in Bangladesh" পরিচয়ে বৈশ্বিক পরিসরে এক শক্তিশালী ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।
লেখক: চেয়ারম্যান, সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইকোনমিক রিসার্চ (CSER)





