হোয়াটসঅ্যাপে সমাধান আদান-প্রদান; ৮ থেকে ১০ লাখ টাকার চুক্তি

মুঠোফোন ঘিরে প্রশ্নফাঁস চক্র: বদরুন্নেসা কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীর কারাদণ্ড, গ্রেফতার সরকারি কর্মচারীসহ ৭

  • কেন্দ্রে মুঠোফোনে প্রশ্নপত্রের ছবি তোলার সময় হাতেনাতে আটক রেশমা, ভ্রাম্যমাণ আদালতে ১ মাসের জেল
  • ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে ফোনে আসে অস্পষ্ট প্রশ্ন; হোয়াটসঅ্যাপ ও চ্যাটে উত্তর তৈরির প্রমাণ পেল এসআরবি-৩
  • এনবিআর, পরিবেশ ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ৫ কর্মচারীসহ গ্রেপ্তার ৭; জব্দ আটটি মোবাইল, চেক ও স্ট্যাম্প

মুঠোফোন ঘিরে প্রশ্নফাঁস চক্র: বদরুন্নেসা কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীর কারাদণ্ড, গ্রেফতার সরকারি কর্মচারীসহ ৭
১৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭:৫২  

স্মার্টফোনের অবৈধ ব্যবহার ও ডিজিটাল চ্যাট প্ল্যাটফর্মকে হাতিয়ার করে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং উত্তর সরবরাহের ঘটনায় কেন্দ্রে এক পরীক্ষার্থীকে এক মাসের কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই চক্রের ডিজিটাল সংযোগ ও মোবাইলভিত্তিক নেটওয়ার্কের সূত্র ধরে সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের পাঁচ কর্মচারীসহ মোট সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি-৩)। চক্রটি মোবাইল ব্যাংকিং, চেক ও নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তির মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থীদের কাছ থেকে মাথাপিছু ৮ থেকে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল।

১৬ অক্টোবর, শুক্রবার রাজধানীর বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষা চলাকালে গোপনে স্মার্টফোনে প্রশ্নপত্রের ছবি তুলে বাইরে পাঠানোর চেষ্টার সময় রেশমা আক্তার (২৫) নামের এক পরীক্ষার্থীকে হাতেনাতে আটক করেন কেন্দ্রের পরিদর্শক। লালবাগ রাজস্ব সার্কেলের সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. আমিনুল ইসলামের ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযোগের সত্যতা পেয়ে রেশমাকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দিয়ে কারাগারে পাঠান এবং তার ব্যবহৃত মুঠোফোনটি জব্দ করেন বলে জানান যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. নূর আলম। সাজাপ্রাপ্ত রেশমার বাড়ি কুড়িগ্রামের রাজারহাট উপজেলায়।

এদিকে প্রশ্নফাঁসের নেপথ্যে স্মার্টফোন ও মেসেজিং অ্যাপ ব্যবহারের ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছে এসআরবি-৩। শুক্রবার বিকেলে কাওরান বাজারে এসআরবির মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, ১৪ থেকে ১৬ অক্টোবর পর্যন্ত ঢাকা ও সাভারের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে চক্রের মূল সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়।

গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর মো. রুবেল ইসলাম (৩৩), চাকরিপ্রত্যাশী মো. মফিজুল ইসলাম (২৩), মো. হাসিনুর রহমান সুজন (৩২), জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে (এনবিআর) কর্মরত কম্পিউটার অপারেটর এস এম ইমদাদুল ইসলাম (৩৫), প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অফিস সহায়ক আসাদুল ইসলাম (৩৩), এনবিআরের অফিস সহায়ক নূর মোহাম্মদ (৩০) এবং এনবিআরে কর্মরত কম্পিউটার অপারেটর জাহাঙ্গীর (৩৮)। তাঁদের হেফাজত থেকে ডিজিটাল অপরাধে ব্যবহৃত আটটি আধুনিক মোবাইল ফোন, প্রশ্নপত্রের এক সেট, ১০০ টাকার ১১৬টি স্ট্যাম্প, ৫০ টাকার ৪টি স্ট্যাম্প, বিভিন্ন পরীক্ষার প্রবেশপত্রের ১৯ পাতা, ১০টি মূল সনদপত্র, বিভিন্ন ক্যাটাগরির ১৫টি প্রশংসাপত্র, বিভিন্ন ব্যাংকের চেকের ৪৮ পাতা, একটি সই করা ব্যাংক চেক, ছয়টি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং নগদ ৪ হাজার টাকা জব্দ করা হয়।

এসআরবি জানায়, গত ১০ অক্টোবর যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা পদের ২৪২টি শূন্যপদের বিপরীতে ৩ লাখ ১৯ হাজার প্রার্থীর বাছাই পরীক্ষা ছিল। বেলা ১১টায় পরীক্ষা শুরুর কথা থাকলেও সকাল ১০টা ৩ মিনিটে ডিজিটাল মাধ্যমে প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রমাণ মেলায় পরীক্ষা স্থগিত করে কর্তৃপক্ষ এবং ১১ অক্টোবর মতিঝিল থানায় মামলা হয়। এসআরবির ছায়া তদন্তে উঠে আসে মোবাইল ফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে ভুয়া পরিচয়ে পরিচালিত যোগাযোগ নেটওয়ার্ক।

গ্রেফতার ব্যক্তিদের মোবাইল ফোনের চ্যাট ও ডিজিটাল ফরেনসিক পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ১০ অক্টোবর ভোর ৪টা ৪৩ মিনিটে নূর মোহাম্মদের ফোনে একটি অজানা উৎস থেকে প্রশ্নপত্রের অস্পষ্ট ছবি আসে। পরবর্তীতে সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে জাহাঙ্গীর তাঁর মোবাইলে সম্পূর্ণ স্পষ্ট একটি প্রশ্নপত্রের ছবি পাঠান। এরপর নূর মোহাম্মদ নিজেই স্মার্টফোনে উত্তর তৈরি করে জাহাঙ্গীর ও ইমদাদুলকে পাঠান। সেখান থেকে আসাদুল, রুবেল, মফিজুল ও সুজনের মাধ্যমে পরীক্ষার্থীদের ফোনে ফোনে প্রশ্ন ও সমাধান ছড়িয়ে দেওয়া হয়। প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে, চক্রের সদস্যের কাছে প্রতারিত হয়ে ক্ষতি পুষিয়ে নিতে মফিজুল উল্টো এই সিন্ডিকেটে যুক্ত হন এবং বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি জালিয়াতির সাথেও তাদের অর্থ লেনদেনের প্রমাণ মিলেছে।

লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, নূর মোহাম্মদ ও জাহাঙ্গীর প্রশ্নপত্রটি ফেসবুকে পাওয়ার দাবি করলেও তা সন্তোষজনক নয়। ফেসবুক গ্রুপ ও আইডিগুলো যাচাই করা হচ্ছে এবং ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণ করে ফাঁসের মূল উৎস শনাক্তে অনুসন্ধান চলছে। এখন পর্যন্ত যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিজস্ব কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর সরাসরি সম্পৃক্ততা না মিললেও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ সরকারি দপ্তরের কর্মীদের অপতৎপরতা নিশ্চিত হওয়া গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে প্রকাশ।

//ডিবিটেক/ডিপিওবিটি/এসএমপি/এমআইএসটি//