সিলিকন রিভারের চার মাস: অর্জন, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও সেমিকন্ডাক্টরে বাংলাদেশের উত্তরণ
গত ১ মে থেকে ৩১ আগস্ট—এই চার মাসে ‘সিলিকন রিভার’ (Silicon River) কী কী অর্জন করেছে, তার একটি বস্তুনিষ্ঠ খতিয়ান তুলে ধরা যাক:
১. দক্ষিণ কোরিয়ায় রোডশো: এসকে হাইনিক্স (SK hynix)-এর প্রেসিডেন্টের আমন্ত্রণে তাদের উন্নত প্যাকেজিং ফ্যাসিলিটি পরিদর্শন; কেএসআইএ (KSIA)-সহ শীর্ষস্থানীয় ৫টি সেমিকন্ডাক্টর কোম্পানির সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং কাইস্ট (KAIST)-এর সঙ্গে ক্রেস্ট (CREST)-এর কৌশলগত দ্বিপাক্ষিক চুক্তি সম্পাদন।
২. যুক্তরাষ্ট্রে সফল রোডশো: অস্টিন, ফিনিক্স, সিলিকন ভ্যালি, ফলসম থেকে শুরু করে পোর্টল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত সফর। এতে ১১টি গ্লোবাল টেক কোম্পানি, ৩টি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় এবং প্রবাসীদের নিয়ে ৫টি বিশেষ নেটওয়ার্কিং সেশন সম্পন্ন।
৩. নীতিগত সংস্কার: জাতীয় স্বার্থে সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের কাঁচামাল ও সরঞ্জাম আমদানির ওপর শুল্ক কার্যকরভাবে ১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা।
৪. ন্যাশনাল সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম ও BEAR Summit 2026: সরকার, শিল্প খাত, শিক্ষাবিদ, প্রবাসী এবং আন্তর্জাতিক অতিথিদের (টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টসের সিটিও-সহ) নিয়ে এক ঐতিহাসিক আয়োজন। এতে ৩,৮৮১ জন নিবন্ধিত অংশগ্রহণকারী, বাংলাদেশি তরুণদের ৩৭টি উদ্ভাবনী প্রদর্শনী এবং ১৩০ জন মেধাবী তরুণের সক্রিয় অবদান নিশ্চিত হয়েছে।
৫. আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণ: এসআইসিআইপি (SICIP)-এর মাধ্যমে বিশেষায়িত চিপ ডিজাইনিং ও সেমিকন্ডাক্টর প্রশিক্ষণের লক্ষ্যে বিশ্বখ্যাত সিনপসিস (Synopsys)-এর সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর।
৬. গ্লোবাল ক্যারিয়ার ও ফেলোশিপ: ওয়াইইএস (YES)-এর সঙ্গে ওয়াইসিআরসি (YCRC) ও ক্রেস্ট ২০২৭-এর জন্য ডাবল ফেলোশিপের সুযোগ, কাউস্ট (KAUST)-এ পেইড ইন্টার্নশিপ এবং গ্লোবালফাউন্ড্রিজে (GlobalFoundries) সরাসরি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু।
৭. সিইএস ২০২৭-এ ঐতিহাসিক আত্মপ্রকাশ: বিশ্বমঞ্চে ‘কনজিউমার ইলেকট্রনিক্স শো’ (CES 2027)-এ প্রথমবারের মতো ‘বাংলাদেশ প্যাভিলিয়ন’-এর চুক্তি সম্পাদন এবং সারা (SARA) প্রোগ্রামে শীর্ষ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সফল অন্তর্ভুক্তি।
৮. তারুণ্যের মেলবন্ধন: ‘সিলিকন রিভার স্টুডেন্টস ব্রাঞ্চ’-এর জন্য দেশের ৫০টিরও বেশি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রায় ৬০০ মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বতঃস্ফূর্ত আবেদন।
এক মুহূর্তের জন্য ভাবুন—যদি ‘সিলিকন রিভার’ না থাকত, তবে এই অর্জনের কয়টি দৃশ্যমান হতো? বড়জোর শুল্ক সংস্কার কিংবা একটি সমঝোতা স্মারক; এর বেশি কিছু নয়।
আমরা যখন বাংলাদেশকে একটি সত্যিকারের ‘নেশন অব ইনোভেশন’ হিসেবে গড়ে তোলার রূপরেখা দিই, তখন দেশের ৭টি প্রধান অংশীজন (Stakeholders)-এর সুনির্দিষ্ট ভূমিকা চিহ্নিত করেছিলাম। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভিশন বক্তব্যে সুস্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল—কোন পক্ষের কী দায়িত্ব পালন করলে আমরা লক্ষ্যপূরণে সফল হব।
বাস্তবে গত চার মাসে এই ৭টি অংশীজনের আচরণ কেমন ছিল?
-
একাডেমিক (Academics): শিক্ষকদের একাংশের মধ্যে এক ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঈর্ষা ও অসন্তোষ দেখা গেছে। শুরু হয়েছে নানামুখী বয়ান তৈরি, তদবিরের মহোৎসব ও অপ্রয়োজনীয় কূটনামি।
-
বিল্ডার্স (Builders - তারুণ্য): তরুণ প্রজন্মই আমাদের প্রকৃত শক্তি। তাদের অফুরন্ত মেধা ও দায়বদ্ধতাই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।
-
নাগরিক (Citizens): সাধারণ মানুষের অফুরন্ত ভালোবাসা ও অকুণ্ঠ সমর্থন পেয়েছি। তাদের এই অটুট আস্থার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।
-
প্রবাসী সমাজ (Diaspora): একটি বিশেষ চক্র দশকের পর দশক কোনো অবদান না রেখে কিংবা ক্ষতিকর ভূমিকা পালন করেও এখন নানা ষড়যন্ত্রমূলক পারফরমেটিভ কর্মকাণ্ডে লিপ্ত।
-
উদ্যোক্তা (Entrepreneurs): সুস্থ প্রতিযোগিতা ও বড় হওয়ার আকাঙ্ক্ষা ইতিবাচক; তবে সক্ষমতা না বাড়িয়ে সিন্ডিকেট তৈরি, অপপ্রচার ও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার অপচেষ্টা জাতীয় অগ্রগতিকে পিছিয়ে দেয়।
-
ফোর্থ কলাম (Media): গণমাধ্যমকর্মীদের মাঝে সেমিকন্ডাক্টর নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তবে কিছু ক্ষেত্রে সুযোগসন্ধানী স্বঘোষিত ‘পণ্ডিতেরা’ গণমাধ্যমকে ভুল বুঝিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টাও করছে।
-
সরকার (Government): প্রশাসনে কিছু অসাধারণ দূরদর্শী কর্মকর্তা রয়েছেন, যাদের আন্তরিক সহযোগিতার শেষ নেই। বিপরীতে কতিপয় ব্যক্তি ব্যস্ত স্রেফ প্রচারের আলো কেড়ে নেওয়ার নাটকে।
অনেকেই বলতে পারেন—এসব তো থাকবেই। কিন্তু সংকট হলো, একটি দেশ হিসেবে আমরা এখন অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ এক সরু রশির ওপর দিয়ে হাঁটছি। বাইরে থেকে অনেকেই সেই রশি ঝাঁকিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে। তার ওপর আমরা যারা সেই রশির ওপর একসঙ্গেই হাঁটছি, তাদেরই কেউ যদি ছুরি দিয়ে রশি কেটে দেওয়ার চক্রান্তে লিপ্ত হয়, তবে পরিণতি কী হবে? সবাই মিলেই খাদে পড়তে হবে। তখন সেই পুরোনো কৌতুকটিই সত্য হবে—আমাদের দোযখের ওপর কোনো প্রহরীর দরকার পড়ে না, কারণ একজন উঠতে গেলেই অন্যজন তার পা টেনে নিচে নামায়।
প্রতিদিন যেসব প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে, তাতে টিকে থাকাটাই এক নিরন্তর সংগ্রাম। তবে এই সংগ্রাম চলবেই, ইনশাআল্লাহ।
পুনশ্চ: অনেকে হয়তো প্রশ্ন তুলবেন—কয় টাকা সরাসরি বিনিয়োগ এলো কিংবা জাতীয় রাজস্ব কত বাড়ল? প্রথমত, এই পুরো কর্মযজ্ঞে সরকারের এক টাকাও ব্যয় হয়নি। দ্বিতীয়ত, যারা ঢালাও সমালোচনা করছেন, তাদের পকেটেরও কোনো টাকা খরচ হয়নি। অথচ প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে ২ মিলিয়ন ডলারের বেশি প্রত্যক্ষ বৈদেশিক আয় অর্জিত হয়েছে এবং ‘ডিজিটাল টুইন’ প্রযুক্তিতে দেশের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বহুলাংশে বেড়েছে। আর কোনো অগ্রগতি যদি কেউ স্বীকার করতে না-ও চান, অন্তত এটুকু নিশ্চিত যে দেশজুড়ে সেমিকন্ডাক্টর নিয়ে অভূতপূর্ব আলোড়ন তৈরি হয়েছে—এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) কল্যাণে রাতারাতি বহু সমালোচকও এখন সেমিকন্ডাক্টর বিশেষজ্ঞ বনে গেছেন!
লেখকঃ চিফ আর্কিটেক্ট, সিলিকন রিভার; অধ্যাপক, পারডু বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিয়ানা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র





