স্বপ্নের স্থপতি কামরুল ইসলাম সিদ্দিক: স্মৃতিতে ও অর্জনে অম্লান এক কর্মবীর
বাংলাদেশ সচিবালয়ের মাত্র দুটি কক্ষ থেকে যাত্রা শুরু করেছিলেন প্রকৌশলী কামরুল ইসলাম সিদ্দিক। এরপর লালমাটিয়ার একটি ভাড়া বাড়ি; সেখান থেকে কয়েক বছরের ব্যবধানে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে গড়ে উঠল দৃষ্টিনন্দন এলজিইডি ভবন। সেই বহুতল ভবনটি ছিল মূলত তাঁর অদম্য স্বপ্ন, সাহস ও অনন্য নেতৃত্বের জীবন্ত প্রতীক।
বীর মুক্তিযোদ্ধা কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের সেই লড়াই ও কর্মযজ্ঞ খুব কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করার বিরল সুযোগ আমার হয়েছিল। একজন সরকারি কর্মকর্তা কীভাবে আমলাতান্ত্রিক গণ্ডি পেরিয়ে সত্যিকারের দূরদর্শী রূপকার হয়ে উঠতে পারেন, তিনি ছিলেন তার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। দুঃসাহসী, নিরলস ও স্বপ্নবান এই মানুষটি বাংলাদেশের গ্রামীণ অবকাঠামো এবং গ্রামীণ অর্থনীতির মানচিত্র আমূল বদলে দিয়েছিলেন। এই উন্নয়নযাত্রায় তাঁর অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোদ্ধা ছিলেন শহীদুল হাসান (যিনি পরবর্তীতে এলজিআরডি সচিবের দায়িত্ব পালন করেছেন)।
কামরুল ইসলাম সিদ্দিকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার অগুনতি স্মৃতি। তিনি আমাকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন, বিশ্বাস করতেন এবং মনের অনেক কথা অকপটে ভাগ করে নিতেন। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান কিংবা গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তাঁর বহুমুখী অভিজ্ঞতা, পেশাগত সাফল্য, নানা সংকট এবং রাজনীতিকদের অন্যায্য আবদার প্রত্যাখ্যানের ফলে তৈরি হওয়া মানসিক যন্ত্রণার কথা তিনি আমাকে বলতেন। তিনি ছিলেন আপসহীন ও স্পষ্টভাষী; অন্যায়কে অন্যায় বলতে কখনো কুণ্ঠাবোধ করতেন না। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব সততার সঙ্গে পালন করতে গিয়ে কী পরিমাণ চাপ ও বৈরিতা তাঁকে সামাল দিতে হয়েছিল, তা কাছ থেকেই দেখেছি ও শুনেছি।
২০০৮ সালে মৃত্যুর কিছুদিন আগে বিশ্ব পানি সম্মেলনে যোগ দিতে তিনি সুইডেন গিয়েছিলেন। সেখান থেকেই আমাকে ফোন করেছিলেন। অনেকক্ষণ কথা হয়েছিল আমাদের। জানিয়েছিলেন, সুইডেন থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ছেলের বাসায় কিছুদিন কাটিয়ে আসন্ন ঈদের পর ঢাকায় ফিরবেন।
লেখকঃ প্রথিতযশা জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক, সম্পাদক ও কলামিস্ট
কিন্তু সেই ফেরা আর কখনোই হয়নি।
আজও সেই শোকাবহ দিনটির কথা স্পষ্ট মনে পড়ে। ২০০৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর অফিসে বসে তাঁর পাঠানো শেষ ই-মেইলটি পড়ছিলাম এবং তাঁর জবাব টাইপ করছিলাম। ঠিক সেই মুহূর্তে টেলিফোন বেজে উঠল। ওপাশে এলজিইডির তৎকালীন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ইফতেখার ভাই।
ভারাক্রান্ত কণ্ঠে তিনি বললেন, “কামরুল ইসলাম সিদ্দিক স্যার আর নেই।”
মুহূর্তের জন্য আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। অবিশ্বাসের সুরে বললাম, “আমি তো ঠিক এই মুহূর্তেই স্যারের মেইলের উত্তর লিখছি!”
ইফতেখার ভাই জানালেন, আমাদের মেইল পাঠানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে বড় ছেলে সাইফের বাসায় তিনি হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হন। ছেলে দ্রুত অ্যাম্বুলেন্স ডাকলেও হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
নিয়তির কী নির্মম পরিহাস—যে মানুষের সঙ্গে ভাববিনিময়ের জন্য আমরা উত্তর লিখি, সেই উত্তর আর কোনোদিন তাঁর কাছে পৌঁছায় না!
অসময়েই চলে গিয়েছিলেন এই কর্মবীর রূপকার। ২০০৮ সালের আজকের এই দিনটিতেই তিনি সবাইকে কাঁদিয়ে না-ফেরার দেশে পাড়ি জমান।
কাল পরিক্রমায় মানুষ চলে যায়, কিন্তু কিছু মানুষ বেঁচে থাকেন তাঁদের অমর সৃষ্টির মাঝে—দেশের পথে প্রান্তরে, মানুষের জীবনযাত্রায় এবং স্মৃতির মণিকোঠায়। এত বছর পরও মাঝে মাঝে মনে হয়, কোনো এক বিকেলে আবার সেই চিরচেনা নম্বর থেকে ফোন আসবে; ওপাশ থেকে ভেসে আসবে স্নেহমাখা সেই কণ্ঠস্বর: “নঈম, কেমন আছেন?”
সেই কণ্ঠ আর কোনোদিন শোনা হবে না।
প্রয়াণ দিবসে গ্রামীণ বাংলাদেশের এই রূপকারকে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি। পরপারে শান্তিতে থাকুন প্রিয় মানুষটি।





