১৮০ দিনে টেলিকম খাত:
সূচকের উন্নতি ৮৫%, সেবা ও বাজেটে চ্যালেঞ্জ ১৫%
ডাক ও টেলিযোগাযোগ খাতের বিগত ১৮০ দিনের কার্যক্রম পর্যালোচনায় দেখা গেছে নীতিগত সংস্কার, অবকাঠামো বিস্তার এবং প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নে বিভিন্ন স্তরে ৭০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত অগ্রগতি অর্জিত হয়েছে। একদিকে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR) বাস্তবায়ন, বিটিআরসির তরঙ্গ নিলামের প্রস্তুতি, ই-কমার্স লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা এবং সাবমেরিন ক্যাবল অবকাঠামো জোরদার হয়েছে; অন্যদিকে অতিরিক্ত শুল্ক ও ডলার সংকটে স্মার্টফোনের দাম ১০-১৫ শতাংশ বৃদ্ধি এবং নেটওয়ার্কের কোয়ালিটি অব সার্ভিস (QoS) পুরোপুরি নিশ্চিত না হওয়ার মতো চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান।
-
শতভাগ অর্জিত খাতসমূহ: ১০টি উদ্যোক্তাভিত্তিক ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস, ১৪টি Fulfillment Center, ক্যাবল শিল্পে ১ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট, GPON ব্রডব্যান্ড প্রসার এবং ৮টি বিমানবন্দর ও ৬টি রেলস্টেশনে বিটিসিএলের ফ্রি ওয়াই-ফাই চালু।
-
প্রগতির তালিকায় থাকা উদ্যোগ: পার্বত্য চট্টগ্রামের ১০০টি স্কুলে স্যাটেলাইট ইন্টারনেটে ৭০%, ফিক্সড ব্রডব্যান্ড QoS মনিটরিংয়ে ৮০%, তরঙ্গ নিলাম প্রস্তুতিতে ৮৫%, আধুনিক মেল মনিটরিং ও স্পেকট্রাম নিয়ন্ত্রণে ৯০% এবং ডিসাস্টার রেসপন্সে ৯৫% অগ্রগতি অর্জিত।
-
নীতি ও বাজার পরিস্থিতি: অবৈধ হ্যান্ডসেট বন্ধে NEIR ও লাইসেন্সিংয়ে LMS চালু হলেও শুল্ক কাঠামোর প্রভাবে স্মার্টফোনের মূল্যবৃদ্ধি এবং অভ্যন্তরীণ কল ড্রপ নিরসনে গ্রাহক পর্যায়ে অসন্তোষ অব্যাহত।
১৮০ দিনের পরিসংখ্যানভিত্তিক আমলনামা ও মূল্যায়ন
| খাত / প্রকল্পের নাম | অগ্রগতি (%) | অর্জিত সাফল্য ও প্রশাসনিক অবস্থান |
| ফ্র্যাঞ্চাইজি পোস্ট অফিস স্থাপন | ১০০% | ১০টি এলাকায় উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে পোস্ট অফিস চালুর লক্ষ্যমাত্রা শতভাগ সফল। |
| বিমানবন্দর ও স্টেশনে ফ্রি ওয়াই-ফাই | ১০০% | বিটিসিএলের মাধ্যমে ৮টি বিমানবন্দর ও ৬টি প্রধান রেলওয়ে স্টেশনে ফ্রি ওয়াই-ফাই সক্রিয়। |
| সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন | ১০০% | বাংলাদেশ ক্যাবল শিল্পে ১ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ প্ল্যান্ট স্থাপন সম্পন্ন। |
| ডাটা প্যাকেজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান | ১০০% | ১০টি বিশ্বাক্যাফে/প্রতিষ্ঠানে হাই-স্পিড ইন্টারনেট ও সস্তা ডাটা প্যাকেজ চালু। |
| ডাক লজিস্টিকস (Fulfillment Center) | ১০০% | ১৪টি সেন্টারে ই-কমার্স পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, বুকিং ও বিতরণ শুরু। |
| NEIR বাস্তবায়ন ও নিরাপত্তা | ১০০% | অবৈধ হ্যান্ডসেট নিয়ন্ত্রণে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার চালু। |
| ইনফ্রাস্ট্রাকচার ও ডিসাস্টার রেসপন্স | ৯৫% | নেটওয়ার্ক মনিটরিং ও জরুরি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সিস্টেমে ৯৫% কাজ সম্পন্ন। |
| স্পেকট্রাম ও ডাক আধুনিকীকরণ | ৯০% | স্পেকট্রাম মনিটরিং এবং Mail Monitoring Software চালুতে ৯০% অগ্রগতি। |
| পরিবহন নেটওয়ার্ক সংযোগ | ৯০% | ৪টি ট্রেন ও বিআরটিসির মহিলা বাসে LEO স্যাটেলাইট ডিভাইস স্থাপন সম্পন্ন। |
| বিটিআরসির তরঙ্গ নিলাম প্রস্তুতি | ৮৫% | নতুন ফোরজি/ফাইভজি তরঙ্গ বরাদ্দের চূড়ান্ত প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন। |
| Fixed Broadband QoS System | ৮০% | নতুন ফিক্সড ব্রডব্যান্ড মনিটরিং সিস্টেম চালুতে ৮০% অগ্রগতি। |
| পার্বত্য চট্টগ্রাম স্কুলে ইন্টারনেট | ৭০% | পাহাড়ি ১০০টি স্কুলের মধ্যে ৭০টিতে LEO স্যাটেলাইট সংযোগ সম্পন্ন। |
| ৩য় সাবমেরিন ক্যাবল | টেস্ট সম্পন্ন | কক্সবাজার Landing Station-এ ইন-স্টেশন টেস্ট ও যন্ত্রপাতি স্থাপন শেষ। |
অগ্রগতি ও ঘাটতির খাত
-
যেখানে সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি: ই-কমার্স লজিস্টিক ব্যবস্থাপনা (Fulfillment Center), গ্রামীণ ও দুর্গম এলাকার (হাওর, পার্বত্য, সুন্দরবন) ব্যাকবোন নেটওয়ার্ক কভারেজ, বিটিআরসির লাইসেন্সিং সিস্টেম ডিজিটাইজেশন (LMS) এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা (NEIR) বাস্তবায়নে সর্বোচ্চ অগ্রগতি এসেছে।
-
যেখানে পিছিয়ে ও চ্যালেঞ্জে: পাহাড়ি এলাকার শতভাগ স্কুলে স্যাটেলাইট ইন্টারনেট পৌঁছানো এখনো ৩০% বাকি। টেলিকম শ্বেতপত্রের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সোশ্যাল অবলিগেশন ফান্ড (SOF) ব্যবহারের দীর্ঘসূত্রতা পুরোপুরি কাটেনি। এছাড়া টেলিটকের ব্যাটারি প্রতিস্থাপন ও ড্রাইভ টেস্ট সম্পন্ন হলেও কল ড্রপ ও দুর্বল ইনডোর সিগন্যাল সমস্যা বজায় রয়েছে। দেশীয় সংযোজন শিল্পে বাজেটের কর নীতি ও ডলার সংকটে মোবাইল ফোনের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রযুক্তি গ্রহণে বাধা তৈরি হয়েছে।
শ্বেতপত্র, পলিসি ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ
টেলিকম খাতের শ্বেতপত্র এবং বিগত বছরের পর্যালোচনায় লাইসেন্স জালিয়াতি, দুর্গম এলাকার জন্য বরাদ্দকৃত সোশ্যাল অবলিগেশন ফান্ড (SOF)-এর অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতার অভাব এবং সাবমেরিন ক্যাবলের অতিরিক্ত চার্জ নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠে এসেছে। বর্তমানে খসড়া টেলিকম পলিসির অধীনে বিটিআরসির লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া সহজ করার পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। MOCSLA-এর জন্য অনলাইন License Management System (LMS) চালু হওয়ায় দীর্ঘদিনের আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
নীতিমালা, সরকার ও উচ্চপর্যায়ের দৃষ্টিভঙ্গি
টেলিকম নীতিমালার খসড়া সংস্কার ও MOCSLA-এর অধীনে অনলাইন লাইসেন্স ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম (LMS) আমলাতান্ত্রিক জটিলতা হ্রাস করলেও গ্রাহক পর্যায়ে সেবার মান নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারির তাগিদ এসেছে। সেসেব আমলে নিয়েই ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বরাবরই বলে আসছেন, "প্রযুক্তির সুফল প্রতিটি ঘরে পৌঁছাতে কাউকে পেছনে ফেলে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের বিকল্প নেই। আমরা পার্বত্য অঞ্চল থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত হাওর এলাকার প্রতিটি নাগরিককে ডিজিটাল নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।" নানা সময়ে গণমাধ্যমে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেছেন, "ডিজিটাল বাংলাদেশের আসল সাফল্য কেবল ব্যান্ডউইথ বাড়ানোয় নয়, বরং ডেটার মূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখা এবং স্থানীয় প্রযুক্তি শিল্পকে আত্মনির্ভরশীল করে তোলাতেই আমাদের আসল লক্ষ্য।"
বিশ্বজুড়ে ৮.৫ কোটি পুরোনো চাকরি কমলেও ৯.৭ কোটি নতুন প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। এআই প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারে বিশ্বব্যাপী সার্বিক উৎপাদনশীলতা বছরে প্রায় ৭% বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আর এর সবটাই নির্ভর করছে শক্তিশালী ডিজিটাল কানেক্টিভিটি ও এর বিস্তারের ওপর। খাতসংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলাপ করলে তারা জানান, কেবল কাগজে-কলমে অগ্রগতি না দেখিয়ে বিটিআরসির মনিটরিং টুলের মাধ্যমে সাধারণ গ্রাহকদের কল ড্রপ ও ধীরগতির ইন্টারনেটের সঠিক সমাধান করতে হবে। ৫,০০০ কিলোমিটার ড্রাইভ টেস্ট বা ব্যাটারি পরিবর্তনের চেয়ে টেলিটকের নেটওয়ার্ক কভারেজ বাড়াতে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করাও জরুরি। শিক্ষার্থীদের মতো অন্যান্য পেশাজীবীদের জন্যও দীর্ঘমেয়াদী সাশ্রয়ী ডাটা পলিসি প্রণয়ন প্রয়োজন। একইসঙ্গে রেডিয়েশন মনিটরিং দ্রুত দেশব্যাপী বাস্তবায়ন করা দরকার। পাশাপাশি টেলিকম খাতের শ্বেতপত্র ধরে সরকারের উচিত হবে এই খাতের অনিয়ম বন্ধ করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। সর্বোপরি, ইন্টারনেটের ব্যাকবোন হিসেবে এর ফাইবারাইজেশনে সর্বোচ্চগুরুত্ব দিয়ে এআই ডেটাসেন্টার স্থাপন, জ্বালানী সঙ্কট মোকাবেলায় বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করা।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এমআইএসটি/এমএসআই//





