এআই অবকাঠামোর নির্ভরশীলতা নিয়ে নতুন প্রশ্ন
একসঙ্গে অচল চ্যাটজিপিটি, ক্লদ, গ্রোক
- একই সময়ে চ্যাটজিপিটি, ক্লদ ও গ্রোকে বড় ধরনের বিভ্রাট
- ১৪ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়ে সেবা পর্যবেক্ষণ প্ল্যাটফর্মে
- অভিন্ন ক্লাউড অবকাঠামো নিয়ে উঠেছে সম্ভাব্য কারণের প্রশ্ন
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় তিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর (এআই) সেবা চ্যাটজিপিটি, ক্লদ ও গ্রোক বৃহস্পতিবার প্রায় একই সময়ে বড় ধরনের বিভ্রাটের মুখে পড়ে। কয়েক ঘণ্টার এই অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে বিপাকে পড়েন বিপুলসংখ্যক ব্যবহারকারী। সেবা-বিভ্রাট পর্যবেক্ষণকারী প্ল্যাটফর্মে ১৪ হাজারের বেশি অভিযোগ জমা পড়ে; এর মধ্যে ওপেনএআইয়ের সেবা নিয়ে অভিযোগ সর্বোচ্চ পর্যায়ে ১২ হাজার ছাড়ায়।
বাংলাদেশ সময় ৩ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার পর থেকে সমস্যার ব্যাপকতা স্পষ্ট হতে শুরু করে। ভারত, সংযুক্ত আরব আমিরাত, যুক্তরাজ্য, বেলজিয়াম, তুরস্ক, জর্ডান, গ্রিস, সিঙ্গাপুর, ভিয়েতনাম ও সুইজারল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের ব্যবহারকারীরা একই ধরনের সমস্যার কথা জানান। অনেক ক্ষেত্রে অনুরোধ পাঠানো যাচ্ছিল না, আবার অনুরোধ গেলেও উত্তর পাওয়া যাচ্ছিল না।
বিশ্বের প্রধান এআই সেবাগুলো একই সময়ে সমস্যায় পড়ার ঘটনা প্রযুক্তি অবকাঠামোর পারস্পরিক নির্ভরতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। তবে তিন প্রতিষ্ঠানের কেউই এখন পর্যন্ত বিভ্রাটের অভিন্ন কোনো মূল কারণ নিশ্চিত করেনি।
চ্যাটজিপিটি ও ক্লদে ব্যাপক প্রভাব
ওপেনএআই জানায়, চ্যাটজিপিটি ও কোডেক্সে ত্রুটির হার অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে কথোপকথন, লগইন, ফাইল আপলোড, ভয়েস মোড, সার্চ, ডিপ রিসার্চ ও ইমেজ জেনারেশনসহ একাধিক সেবায়। ওপেনএআইয়ের স্ট্যাটাস পেজে পরে জানানো হয়, চ্যাটজিপিটি ও কোডেক্সের ত্রুটির সমস্যা সমাধান করা হয়েছে এবং সেবা স্বাভাবিক হয়েছে।
অ্যানথ্রপিকের স্ট্যাটাস পেজেও ক্লদ মডেল ও সংশ্লিষ্ট সেবায় ত্রুটির কথা জানানো হয়। বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টা ২৬ মিনিটের দিকে ক্লদ মিথোস ৫.১, ফেবল ৫.১ ও ওপাস ৫ মডেলে ত্রুটি শনাক্ত হয়। পরে মিথোস ৫, ফেবল ৫, ওপাস ৪.৮ ও ওপাস ৪.৬ মডেলও তালিকায় যুক্ত হয়।
ক্লদ এআই, ক্লদ এপিআই, ক্লদ কোড ও ক্লদ কোওয়ার্ক—সবগুলো সেবাই কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অ্যানথ্রপিক পরে জানায়, ত্রুটির কারণ শনাক্ত করে সমাধান প্রয়োগ করা হয়েছে এবং সেবাগুলো স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরেছে।
গ্রোকেও একই সময়ে বিভ্রাট
ইলন মাস্কের এআই প্রতিষ্ঠান এক্সএআইও গ্রোকের বিভ্রাটের বিষয়টি নিশ্চিত করে। গ্রোকের ওয়েব সংস্করণের পাশাপাশি অ্যান্ড্রয়েড ও আইওএস অ্যাপেও ব্যবহারকারীরা সেবা ব্যবহারে সমস্যায় পড়েন।
এক্সে গ্রোক ব্যবহার করে প্রম্পট পাঠালে কিছু ব্যবহারকারী মডেল অতিরিক্ত চাপে থাকার মতো বার্তা পাচ্ছিলেন। এক্সএআইয়ের স্ট্যাটাস তথ্য অনুযায়ী, ৩ সেপ্টেম্বর মডেল-সংশ্লিষ্ট বিভ্রাট কয়েক ঘণ্টা স্থায়ী হয় এবং পরে তা সমাধান করা হয়।
নির্ভরশীল সেবাতেও ধাক্কা
বিভ্রাটের প্রভাব পড়ে এআই-নির্ভর তৃতীয় পক্ষের সেবাতেও। এআই কোডিং টুল কার্সর জানায়, ক্লদ ও গ্রোকের সমস্যার কারণে তাদের সেবাও ব্যাহত হয়েছে। ফলে এআই মডেলের ওপর নির্ভর করে সফটওয়্যার উন্নয়ন করা ডেভেলপারদের চলমান কাজও বাধাগ্রস্ত হয়।
এই ঘটনা দেখিয়েছে, ব্যবহারকারীর কাছে আলাদা আলাদা এআই প্ল্যাটফর্ম হিসেবে উপস্থিত থাকলেও পেছনের অবকাঠামোতে তাদের নির্ভরশীলতা একাধিক স্তরে যুক্ত থাকতে পারে।
কীভাবে স্বাভাবিক হলো
বাংলাদেশ সময় রাতের দিকে পর্যায়ক্রমে সেবাগুলো স্বাভাবিক হতে শুরু করে। ওপেনএআই জানায়, সমস্যার সমাধান প্রয়োগ করা হয়েছে এবং চ্যাটজিপিটি ও কোডেক্সের সেবা পুনরুদ্ধার হচ্ছে। পরে প্রতিষ্ঠানটি জানায়, প্রভাবিত সেবাগুলো পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়েছে।
অ্যানথ্রপিকও কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ক্লদের বিভ্রাট সমাধানের কথা জানায়। গ্রোক তুলনামূলকভাবে পরে স্বাভাবিক অবস্থায় ফেরে। এক্সএআইয়ের স্ট্যাটাস পেজে ৩ সেপ্টেম্বরের মডেল বিভ্রাট পরে ‘রিজলভড’ হিসেবে চিহ্নিত হয়।
আজুর নিয়ে প্রশ্ন, তবে নিশ্চিত নয়
তিনটি প্ল্যাটফর্ম প্রায় একই সময়ে সমস্যায় পড়ায় সম্ভাব্য অভিন্ন অবকাঠামোগত কারণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে মাইক্রোসফট আজুরকে ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, একই সময়ে আজুরেও কিছু বিভ্রাটের খবর পাওয়া যায় এবং এআই সেবাগুলোর অবকাঠামোর সঙ্গে আজুরের সংযোগ রয়েছে।
তবে এখন পর্যন্ত চ্যাটজিপিটি, ক্লদ বা গ্রোক—কোনো প্রতিষ্ঠানই আজুরকে এই সম্মিলিত বিভ্রাটের মূল কারণ হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে দায়ী করেনি। ফলে আজুরের সমস্যার সঙ্গে তিন এআই প্ল্যাটফর্মের বিভ্রাটের সরাসরি কারণ-সম্পর্ক রয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সময় এখনো আসেনি।
গুগলের জেমিনিও একই সময়ে কিছু ব্যবহারকারীর অভিযোগের মুখে পড়ে। তবে গুগল আনুষ্ঠানিকভাবে বড় ধরনের বিভ্রাট স্বীকার করেনি। জেমিনি গুগলের নিজস্ব ক্লাউড অবকাঠামোর ওপর পরিচালিত হওয়ায় ঘটনাটি এআই সেবার অবকাঠামোগত বৈচিত্র্য নিয়েও নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
প্রযুক্তি গবেষকদের মতে, বড় এআই প্ল্যাটফর্মগুলো একক কোনো অবকাঠামোর ওপর নির্ভর করে না; এগুলো একাধিক ক্লাউড, ডেটা সেন্টার, নেটওয়ার্ক ও তৃতীয় পক্ষের প্রযুক্তির সমন্বিত ব্যবস্থায় পরিচালিত হয়। তাই একই সময়ে একাধিক সেবায় বিভ্রাট দেখা গেলেও সেটিকে এখনই একটি একক ব্যর্থতার বিন্দু হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না।
তবে ঘটনাটি এআই সেবার ক্রমবর্ধমান নির্ভরশীলতা এবং পেছনের ক্লাউড অবকাঠামোর স্থিতিশীলতা, বৈচিত্র্য ও বিকল্প ব্যবস্থার গুরুত্বকে সামনে এনেছে।
//ডিবিটেক/ইএমও/আইএইচ/এসএমই//





