ফিরে দেখা:
ইন্টারনেটহীন বাংলাদেশের সেই ‘ডিজিটাল মৃত্যু উপত্যকা’
১৮ জুলাই ২০২৪। সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে বাংলাদেশের ডিজিটাল মানচিত্রে নেমে আসে এক নজিরবিহীন অন্ধকার। প্রথমে মোবাইল ইন্টারনেট, পরে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে এবং ব্রডব্যান্ড সংযোগ—ধাপে ধাপে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে গোটা দেশ। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই বিশ্বের সঙ্গে বাংলাদেশের ডিজিটাল যোগাযোগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।
সেই দিন থেকে শুরু হয় এমন এক সময়, যাকে প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার, সফটওয়্যার রপ্তানিকারক, ই-কমার্স ব্যবসায়ী এবং সাধারণ ব্যবহারকারীরা এখনও স্মরণ করেন ‘ডিজিটাল মৃত্যু উপত্যকা’ হিসেবে।
দুই বছর পর ফিরে তাকালে স্পষ্ট হয়, এটি শুধু একটি ইন্টারনেট বিভ্রাট ছিল না; এটি ছিল বাংলাদেশের ডিজিটাল অর্থনীতি, নাগরিক যোগাযোগ ও রাষ্ট্র পরিচালনার ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত এবং ব্যয়বহুল সিদ্ধান্তগুলোর একটি। আর এই অভিজ্ঞতার পরই দেশের টেলিযোগাযোগ আইনে পরিবর্তন এনে নির্বিচারে ইন্টারনেট বন্ধের সুযোগ সীমিত করা হয়।
১৮ জুলাই: যেভাবে অন্ধকার নেমেছিল
২০২৪ সালের ১৮ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনকে ঘিরে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে সন্ধ্যার পর প্রথমে মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করা হয়। পরে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) নির্দেশে আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট গেটওয়ে (IIG), ইন্টারন্যাশনাল টেরেস্ট্রিয়াল কেবল (ITC), সাবমেরিন কেবল এবং ব্রডব্যান্ড অপারেটরদের ধাপে ধাপে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দেওয়া সাক্ষ্যেও এই ধাপভিত্তিক বন্ধের বিষয়টি উঠে আসে।
সরকারি ব্যাখ্যায় বলা হয়েছিল, টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সেবা ব্যাহত হয়েছে। অন্যদিকে দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক ও মানবাধিকার সংস্থাগুলো একে রাষ্ট্রের নির্দেশে পরিচালিত জাতীয় ইন্টারনেট শাটডাউন হিসেবে চিহ্নিত করে।
কতদিন বিচ্ছিন্ন ছিল বাংলাদেশ?
জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তর (OHCHR), ইন্টারনেট সোসাইটি (ISOC) এবং বিভিন্ন পর্যবেক্ষক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী—
- পুরো দেশ প্রায় পাঁচ দিন কার্যত ইন্টারনেট বিচ্ছিন্ন অবস্থায় ছিল।
- ২৩ ও ২৪ জুলাই পরীক্ষামূলকভাবে ব্রডব্যান্ড ফিরতে শুরু করে।
- ২৮ জুলাই মোবাইল ইন্টারনেট পুনরায় চালু হয়।
- তবে ফেসবুক, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ইউটিউব, টিকটকসহ একাধিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আরও কয়েক দিন বন্ধ ছিল।
বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাত গত এক দশকে রপ্তানি, ফ্রিল্যান্সিং, স্টার্টআপ, ই-কমার্স এবং ডিজিটাল আর্থিক সেবার ওপর নির্ভরশীল একটি অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলেছিল। সেই কাঠামো কয়েক দিনের মধ্যেই ভেঙে পড়ে।
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস), ই-কমার্স উদ্যোক্তা ও শিল্পসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী, শুধু আইসিটি ও ই-কমার্স খাতেই প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়।
অন্যদিকে জাতিসংঘের মানবাধিকার দপ্তরের প্রতিবেদনে ব্যবসায়ী সংগঠনের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, সামগ্রিক অর্থনীতির ক্ষতির পরিমাণ ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত হতে পারে বলে তখন আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল।
সেসময় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন—
- প্রায় সাড়ে ছয় লাখ ফ্রিল্যান্সার;
- সফটওয়্যার রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান;
- ই-কমার্স ব্যবসা;
- মোবাইল আর্থিক সেবা;
- অনলাইনভিত্তিক ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা;
- রাইড শেয়ারিং ও ফুড ডেলিভারি প্ল্যাটফর্ম।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্স জানায়, অনেক ফ্রিল্যান্সার বিদেশি ক্লায়েন্ট হারান, ছোট ব্যবসা অর্ডার বাতিল করতে বাধ্য হয় এবং পর্যটন, ক্ষুদ্র উৎপাদন ও অনলাইন বিপণন কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়ে।
থেমে গিয়েছিল দৈনন্দিন জীবন
ইন্টারনেট না থাকায় অনলাইন ব্যাংকিং, এটিএম নেটওয়ার্ক, মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস, হাসপাতালের কিছু ডিজিটাল সেবা, সরকারি অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং প্রবাসীদের সঙ্গে যোগাযোগও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষ ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা ও জরুরি অনলাইন পরিষেবা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। চলমান সংকটে অনেকেই স্বজনদের খোঁজ পর্যন্ত নিতে পারেননি।
ইন্টারনেট ফিরতেই বিস্ফোরণ সোশ্যাল মিডিয়ায়
দীর্ঘ কয়েক দিনের নীরবতার পর যখন সংযোগ ফিরতে শুরু করে, তখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেন তথ্যের সুনামি বয়ে যায়।
হাজার হাজার ছবি, ভিডিও, প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা, নিখোঁজ ব্যক্তিদের তথ্য, হতাহতদের তালিকা এবং আন্দোলনের নানা মুহূর্ত একসঙ্গে প্রকাশ পেতে থাকে। অনেক ব্যবহারকারী প্রথম পোস্টেই লিখেছিলেন—"ফিরলাম", "নেট এসেছে", "সবাই ঠিক আছেন?"
এই কয়েক দিনের জমে থাকা ডিজিটাল স্মৃতি মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে।
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচনা
ইন্টারনেট সোসাইটি, অ্যাকসেস নাউ, ফ্রিডম হাউসসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা বাংলাদেশের এই শাটডাউন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে।
তাদের পর্যবেক্ষণ ছিল, ইন্টারনেট এখন বিদ্যুৎ বা সড়ক অবকাঠামোর মতোই একটি মৌলিক জাতীয় অবকাঠামো। নিরাপত্তা সংকট মোকাবিলায় পুরো দেশের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি, নাগরিক অধিকার ও আন্তর্জাতিক আস্থার জন্য ক্ষতিকর।
আইনও বদলে গেল
জুলাইয়ের অভিজ্ঞতার পর বাংলাদেশে টেলিযোগাযোগ নীতিমালা ও আইনি কাঠামো নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়। প্রযুক্তি খাত, ব্যবসায়ী সংগঠন, নাগরিক সমাজ এবং ডিজিটাল অধিকারকর্মীরা নির্বিচারে ইন্টারনেট বন্ধের ক্ষমতা পুনর্বিবেচনার দাবি জানান।
পরবর্তীতে টেলিযোগাযোগ আইন সংশোধন করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে সারা দেশে ইন্টারনেট বা টেলিযোগাযোগ সেবা বন্ধের ক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে সীমিত করা হয়, যাতে ভবিষ্যতে একই ধরনের জাতীয় ব্ল্যাকআউট সহজে আরোপ করা না যায়। এই পরিবর্তনকে দেশের ডিজিটাল অধিকার সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ইতিহাসের শিক্ষা
দুই বছর পর ২০২৪ সালের জুলাইকে শুধু একটি রাজনৈতিক সংকটের সময় হিসেবে নয়, বাংলাদেশের ডিজিটাল রাষ্ট্রব্যবস্থার একটি মোড় পরিবর্তনের মুহূর্ত হিসেবেও দেখা হয়। সেই কয়েক দিনের ইন্টারনেট অন্ধকার দেখিয়ে দিয়েছিল—ইন্টারনেট আর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আর্থিক লেনদেন, সংবাদ, প্রশাসন এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অবকাঠামো।
ডিজিটাল বাংলাদেশের যাত্রায় ১৮ জুলাই ২০২৪ তাই শুধু একটি তারিখ নয়; এটি এমন এক সতর্কবার্তা, যা রাষ্ট্রকে মনে করিয়ে দিয়েছে—একটি দেশের ইন্টারনেট বন্ধ মানে শুধু নেটওয়ার্ক বন্ধ নয়, থেমে যায় একটি জাতির জীবনের স্পন্দনও।
//ডিবিটেক/আইএইচ//এসএমই//





