এআইনির্ভর কোয়ান্টাম চিপ তৈরি করল মাইক্রোসফট
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অভাবনীয় শক্তিকে কাজে লাগিয়ে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের দুনিয়ায় এক বিশাল মাইলফলক স্পর্শ করেছে বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি জায়ান্ট মাইক্রোসফট। গত মঙ্গলবার প্রতিষ্ঠানটি সম্পূর্ণ নতুন প্রযুক্তির একটি কোয়ান্টাম কম্পিউটিং চিপ উন্মোচন করেছে, যা ডিজাইন বা নকশা করার ক্ষেত্রে সরাসরি এআই টুলের সাহায্য নেওয়া হয়েছে। একই সাথে মাইক্রোসফট ঘোষণা দিয়েছে যে, আগামী ২০২৯ সালের মধ্যেই তারা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারযোগ্য পূর্ণাঙ্গ কোয়ান্টাম কম্পিউটার সিস্টেম বাজারে আনতে সক্ষম হবে।
মাইক্রোসফটের এই নতুন সময়সীমা ঘোষণার ফলে কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের বৈশ্বিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। কারণ তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী আইবিএম-ও গত মাসে কোয়ান্টাম প্রযুক্তির পেছনে ১০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের মেগা প্ল্যান ঘোষণা করে ২০২৯ সালকেই তাদের লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে নির্ধারণ করেছিল।
এর আগে মাইক্রোসফট তাদের কোয়ান্টাম প্রজেক্টের জন্য নির্দিষ্ট কোনো সাল ঘোষণা না করে কেবল জানিয়েছিল যে, এটি কয়েক দশকের বিষয় নয়, বরং মাত্র কয়েক বছরের ব্যাপার।
বর্তমানে ঔষধ প্রস্তুত প্রণালী, জটিল রসায়ন এবং সাইবার নিরাপত্তার মতো অতি সংবেদনশীল খাতের যেসব জটিল গাণিতিক সমস্যা সমাধান করতে সাধারণ সুপার কম্পিউটারেরও হাজার বছর লেগে যাবে, তা মাত্র কয়েক সেকেন্ডে করার জন্য গুগল, আমাজন এবং বেশ কিছু চীনা প্রতিষ্ঠানের সাথে তীব্র প্রতিযোগিতায় লিপ্ত রয়েছে মাইক্রোসফট ও আইবিএম। আর এই দৌড়েই মাইক্রোসফটের নতুন বাজি হলো তাদের সদ্য উন্মোচিত ‘ম্যাজোরানা ২’ চিপ।
মাইক্রোসফটের এই নিজস্ব চিপটির সবচেয়ে বড় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে এর উপাদান বা ম্যাটেরিয়ালস ব্যবহারের ক্ষেত্রে। গুগল, আইবিএম এবং অন্যান্য অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান যেখানে কোয়ান্টাম চিপ তৈরির জন্য অ্যালুমিনিয়ামের তৈরি সুপারকন্ডাক্টিং তার ব্যবহার করে, সেখানে মাইক্রোসফট তাদের চিপ তৈরিতে ব্যবহার করেছে সীসা বা লেড। উপাদান বিজ্ঞানের জন্য তৈরি মাইক্রোসফটের নিজস্ব এআই টুল ব্যবহার করে এই বিশাল পরিবর্তনটি করা সম্ভব হয়েছে।
মাইক্রোসফটের কোয়ান্টাম বিভাগের এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট জেসন জ্যান্ডার জানিয়েছেন, এই এআই-চালিত উপাদান পরিবর্তনের ফলে ম্যাজোরানা ২ চিপের কিছু কিছু কর্মক্ষমতা আগের সংস্করণের তুলনায় প্রায় ১ হাজার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। চিপ উৎপাদন প্রক্রিয়ার মূল সাফল্য ছিল পানিতে দ্রবণীয় সীসাকে এমনভাবে চিপে ব্যবহার করা, যাতে ম্যানুফ্যাকচারিংয়ের সময় তা ধুয়ে বা নষ্ট হয়ে না যায়। জ্যান্ডার বলেন, “মানুষ সাধারণত চিপ তৈরিতে সীসা ব্যবহার করে না, কারণ এর জন্য অত্যন্ত বিশেষায়িত ও জটিল প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। আর আমরা এআই-এর সহায়তায় সেই জটিল রহস্যটিই ভেদ করতে পেরেছি।”
এই অভাবনীয় সাফল্যের মধ্যেও মাইক্রোসফটকে তীব্র বৈজ্ঞানিক সমালোচনার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। পদার্থবিজ্ঞানীদের একটি বড় অংশ দাবি করছেন, মাইক্রোসফট তাদের এই আবিষ্কারের সপক্ষে পর্যাপ্ত পাবলিক ডেটা বা উন্মুক্ত বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রকাশ করেনি, যার ফলে এই কোয়ান্টাম দাবির সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা অসম্ভব।
বিখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’ ইতিমধ্যেই মাইক্রোসফটের ২০২০ সালের একটি পুরোনো গবেষণার ডেটা নিয়ে তদন্তের নোটিশ দিয়েছিল এবং সমালোচকদের মতে, সেই পুরোনো ত্রুটিপূর্ণ প্রোটোকল ও ডেটার সমস্যা মঙ্গলবারের নতুন গবেষণাতেও রয়ে গেছে। স্কটল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি অব সেন্ট অ্যান্ড্রুজ-এর কোয়ান্টাম ফিজিক্সের লেকচারার হেনরি লেগ কড়া সমালোচনা করে বলেন, “মাইক্রোসফট তাদের চিপে যত খুশি সীসা ব্যবহার করতে পারে, কিন্তু এটি তাদের বিজ্ঞানের মৌলিক নীতি থেকে আড়াল করতে পারবে না যে—আপনার গবেষণার ফলাফল অন্য বিজ্ঞানীদের দ্বারাও পুনরুৎপাদনযোগ্য বা প্রমাণিত হতে হবে।”
পদার্থবিজ্ঞানীদের এই সমালোচনার জবাবে মাইক্রোসফট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বাণিজ্যিক গোপনীয়তা বা ‘ট্রেড সিক্রেট’ রক্ষা করার স্বার্থেই তারা সব ডেটা জনসমক্ষে প্রকাশ করতে পারছে না। তবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশেষ সংস্থা ‘ডারপা’-র সাথে অত্যন্ত গোপনীয় আলোচনার মাধ্যমে এই সংক্রান্ত সব বিস্তারিত ডেটা শেয়ার করেছে, যারা বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের কোয়ান্টাম সিস্টেমের কার্যকারিতা মূল্যায়ন করছে।
সমালোচকদের আশ্বস্ত করে জেসন জ্যান্ডার বলেন, “পদার্থবিজ্ঞানের নিয়মনীতি মেনেই আমরা এই দারুণ ডেটা পেয়েছি। বিশ্বাস করুন, বিজ্ঞানের ভিত্তির ওপর যদি আমার পূর্ণ আস্থা না থাকত, তবে আমি ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের পেছনে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ কখনো অপচয় করতাম না।”
ডিবিটেক/বিএমটি । সূত্র: রয়টার্স





