সাংবাদিকতার স্বাধীনতা সুরক্ষার দাবি; ১২ সুপারিশ
সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও সাইবার নিরাপত্তার ভারসাম্য চায় সম্পাদক পরিষদ
- সাংবাদিকতার জন্য গ্রেপ্তার, তল্লাশি ও নজরদারিতে বিচারিক অনুমোদন চায় সম্পাদক পরিষদ
- জনস্বার্থে সংবাদ প্রকাশ ও বৈধ মতপ্রকাশকে অপরাধের আওতামুক্ত রাখার প্রস্তাব
- কনটেন্ট অপসারণে স্বচ্ছতা, প্রেস কাউন্সিলের কার্যকারিতা ও স্বাধীন তদারকি নিশ্চিত করার দাবি
সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি স্বাধীন সাংবাদিকতা, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ এবং বৈধ মতপ্রকাশের সাংবিধানিক অধিকার সুরক্ষায় প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনে স্পষ্ট আইনি কাঠামো, বিচারিক তদারকি ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সম্পাদক পরিষদ। এ লক্ষ্যে সংগঠনটি প্রস্তাবিত আইনের ওপর ১২ দফা সুপারিশ দিয়েছে।
রোববার সম্পাদক পরিষদের সভাপতি নূরুল কবির ও সাধারণ সম্পাদক দেওয়ান হানিফ মাহমুদের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে জানানো হয়, তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রীর কাছে পৌঁছানোর জন্য সুপারিশগুলো প্রধান তথ্য কর্মকর্তা সৈয়দ আবদাল আহমদের দপ্তরে জমা দেওয়া হয়েছে।
বিবৃতিতে সম্পাদক পরিষদ জানায়, কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করা, গ্রেপ্তার, তল্লাশি, জব্দ, নজরদারি এবং ডিজিটাল তথ্যের ওপর হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, সুনির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি, দ্রুত বিচারিক তদারকি ও কার্যকর প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকতে হবে। সাংবাদিকদের পেশাগত কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও নির্বাহী ক্ষমতার পরিবর্তে স্বাধীন বিচারিক প্রক্রিয়া ও যথাযথ আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে।
সম্পাদক পরিষদের ১২ দফা সুপারিশ
১. সাংবাদিকতা ও বৈধ মতপ্রকাশের স্পষ্ট সুরক্ষা
পেশাগত দায়িত্বের অংশ হিসেবে জনস্বার্থে প্রকাশিত সংবাদ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, বিশ্লেষণ ও মতামতকে শুধু বিষয়বস্তু বা সমালোচনামূলক অবস্থানের কারণে সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে না—এমন সুস্পষ্ট সুরক্ষা আইনে যুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছে সম্পাদক পরিষদ।
জনস্বার্থ, ন্যায্য সমালোচনা, মতামত, রম্য, কার্টুন, প্যারোডি, ভোক্তার অভিযোগ, রাজনৈতিক সমালোচনা এবং পেশাগত সাংবাদিকতার অংশ হিসেবে অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য কাউকে অপরাধী সাব্যস্ত করা যাবে না। মতপ্রকাশের সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো অপরাধকে অজামিনযোগ্য করা যাবে না।
সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের অধিকার সুরক্ষায় প্রণীত বিশেষ কোনো আইন এবং প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইনের মধ্যে অসামঞ্জস্য দেখা দিলে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকার রক্ষাকারী বিধানকে প্রাধান্য দিতে হবে।
২. সাংবাদিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আগে বিচারিক অনুমোদন
সাংবাদিকের পেশাগত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত অভিযোগে গ্রেপ্তার, তল্লাশি, জব্দ, ডিজিটাল ডিভাইস বা তথ্য-উপাত্তে প্রবেশ এবং নজরদারির মতো ব্যবস্থা নেওয়ার আগে আদালতের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যতিক্রমী ব্যবস্থা নেওয়া হলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আদালতের পরবর্তী অনুমোদন বা পর্যালোচনা নিশ্চিত করতে হবে। এ ধরনের মামলা জামিনযোগ্য হওয়ার প্রস্তাবও দিয়েছে সম্পাদক পরিষদ।
৩. ভুল তথ্য, অপতথ্য ও গুজবের পৃথক সংজ্ঞা
ভুল বা অসম্পূর্ণ তথ্যকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। ভুল তথ্য, অপতথ্য ও গুজবের পৃথক সংজ্ঞা আইনে নির্ধারণ করতে হবে। কোনো তথ্য শুধু অযাচাইকৃত বা অসমর্থিত হওয়ার কারণে তাকে অপরাধের উপাদান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না।
একই সঙ্গে বুলিং, মানহানি, হেয়প্রতিপন্ন করা, রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর বক্তব্য, বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষুণ্ন করা, যৌন হয়রানি ও সেক্সটর্শনের মতো বিষয়ের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে সংগঠনটি।
৪. জনস্বার্থের সাংবাদিকতায় আইনি সুরক্ষা
দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম, পরিবেশগত ক্ষতি, জনস্বাস্থ্য, ভোক্তার অধিকার, সরকারি ব্যয় এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের অনিয়মের মতো জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সংবাদ, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও বিশ্লেষণ প্রকাশের ক্ষেত্রে জনস্বার্থের সুরক্ষা আইনে স্পষ্টভাবে স্বীকৃত হতে হবে।
৫. সরকারের সমালোচনা ও সাইবার অপরাধের সীমারেখা নির্ধারণ
সরকার, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, সরকারি কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি বা সরকারি নীতির সমালোচনা, রাজনৈতিক মতামত, বিশ্লেষণ, ব্যঙ্গ ও বিদ্রুপাত্মক মতপ্রকাশকে সাইবার অপরাধ হিসেবে গণ্য করা যাবে না। কোনো বক্তব্যকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করতে হলে আইনে নির্ধারিত অপরাধের উপাদান প্রমাণ করতে হবে। ‘রাষ্ট্রকে হেয়প্রতিপন্ন করা’র মতো অস্পষ্ট শব্দবন্ধ আইন থেকে বাদ দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে সম্পাদক পরিষদ।
‘রাষ্ট্রের জন্য অবমাননাকর’, ‘বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ক্ষুণ্ন’ এবং ‘রাষ্ট্রের নিরাপত্তা’—এ ধরনের ধারণার সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে হবে। সাংবাদিকতা, গবেষণা, মানবাধিকারসংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষণ, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কিংবা জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশকে এসব ধারণার সঙ্গে যুক্ত করা যাবে না। এ-সংক্রান্ত অপরাধকেও অজামিনযোগ্য করা যাবে না।
৬. কনটেন্ট অপসারণ ও ব্লক করার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা
সংবাদ, পোস্ট, ভিডিও বা ডিজিটাল কনটেন্ট অপসারণ কিংবা ব্লক করার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট আইনি ভিত্তি, লিখিত কারণ ও প্রয়োজনীয়তার ব্যাখ্যা থাকতে হবে। জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে।
প্রতিটি আদেশের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্বাধীন কর্তৃপক্ষ বা আদালতে আপিল এবং বিচারিক পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকতে হবে। জরুরি ভিত্তিতে কনটেন্ট ব্লক করা হলে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আদালতের পরবর্তী অনুমোদন বা পর্যালোচনা বাধ্যতামূলক করতে হবে। কনটেন্ট অপসারণ বা ব্লক করার তথ্যও জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
৭. মানহানি ও অপমানের সীমারেখা স্পষ্ট করা
অনলাইনে মানহানিকে নতুন ও অধিকতর কঠোর সাইবার অপরাধ হিসেবে বিবেচনা না করে বিদ্যমান কাঠামোর আওতায় বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলে পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছে সম্পাদক পরিষদ।
৮. সাংবাদিকতা-সংক্রান্ত অভিযোগে মোবাইল কোর্ট ও নির্বাহী ক্ষমতা বন্ধ
সংবাদ প্রকাশ, মতপ্রকাশ, মানহানি বা সাংবাদিকতার বিষয়বস্তু নিয়ে অভিযোগের বিচার মোবাইল কোর্ট কিংবা নির্বাহী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে করা যাবে না। এ ধরনের বিরোধে গ্রেপ্তার, জরিমানা, কনটেন্ট অপসারণ বা অন্যান্য শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে বিচারিক তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।
৯. প্রতিবেদনের জন্য পুরো সংবাদমাধ্যমকে শাস্তি না দেওয়া
কোনো প্রতিবেদন বা প্রকাশনার কারণে পুরো সংবাদমাধ্যমের কার্যক্রম বন্ধ, নিবন্ধন বাতিল কিংবা প্রতিষ্ঠানকে অযৌক্তিক শাস্তির মুখে ফেলা যাবে না। এ-সংক্রান্ত বিষয়গুলো বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের ওপর ন্যস্ত করার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
১০. সাংবাদিকের তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা রক্ষা
তথ্যসূত্রের নিরাপত্তাকে সাংবাদিকতার অন্যতম ভিত্তি উল্লেখ করে সম্পাদক পরিষদ বলেছে, কোনো সাংবাদিককে তাঁর তথ্যসূত্রের পরিচয় প্রকাশে বাধ্য করা যাবে না।
১১. পেশাগত বিরোধে প্রেস কাউন্সিলের প্রক্রিয়া কার্যকর করা
সাংবাদিকতা, সংবাদ প্রকাশ, পেশাগত আচরণ, নৈতিকতা কিংবা সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সম্পর্কিত অভিযোগের প্রকৃতি অনুমোদন করলে সরাসরি ফৌজদারি ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে প্রথমে বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের বিদ্যমান অভিযোগ ও অনুসন্ধান প্রক্রিয়া কার্যকর করতে হবে।
এ জন্য প্রয়োজনে প্রেস কাউন্সিলের এখতিয়ার ও কার্যকারিতা আধুনিকায়ন করতে হবে, যাতে সংবাদপত্রের পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক ডিজিটাল সংবাদমাধ্যমও এর আওতায় আসে।
১২. জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের স্বাধীনতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা
সাইবার আইনের অধীনে তদন্ত, গ্রেপ্তার, তল্লাশি, জব্দ, নজরদারি ও কনটেন্ট অপসারণের ক্ষমতা প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর ওপর জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিলের কার্যকর ও স্বাধীন তদারকি থাকতে হবে।
কাউন্সিলের গঠন, সদস্যদের স্বাধীনতা, সদস্য ও তদন্ত কর্মকর্তাদের ক্ষমতার সীমা এবং সিদ্ধান্তের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এতে সাইবার নিরাপত্তা, আইন ও মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি গণমাধ্যম ও সম্পাদকীয় নেতৃত্বে অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার সুপারিশ করেছে সম্পাদক পরিষদ।
কাউন্সিলের জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্ত, নীতিগত সুপারিশ ও ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়ে স্বচ্ছতা এবং জনসমক্ষে তথ্য প্রকাশের ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
সাইবার নিরাপত্তা ও স্বাধীন গণমাধ্যমের সহাবস্থানের আহ্বান
সম্পাদক পরিষদ মনে করে, সাইবার নিরাপত্তা, সাইবার অপরাধ এবং ডিজিটাল পরিসরে সাংবাদিকতা পৃথক বিষয়। প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা (সংশোধন) আইনে এসব বিষয়ের মধ্যকার প্রয়োজনীয় সীমারেখা অনেক ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট নয়। সংগঠনটির মতে, এই অস্পষ্টতা স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার অন্তরায় এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
বিবৃতিতে সরকারকে বিষয়গুলোর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ও পরিসর স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে আইনটি পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
সম্পাদক পরিষদ বলেছে, “স্বচ্ছতা, বিচারিক তদারকি, জবাবদিহি ও কার্যকর প্রতিকারের নিশ্চয়তার মধ্য দিয়েই একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও জনবান্ধব সাইবার আইন প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।”
সংগঠনটি আশা প্রকাশ করেছে, সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের মতামত বিবেচনায় নিয়ে আইনটিতে প্রয়োজনীয় ভারসাম্য নিশ্চিত করা হবে। এতে সাইবার নিরাপত্তা জোরদার ও সাইবার অপরাধ কার্যকরভাবে মোকাবিলার পাশাপাশি স্বাধীন সাংবাদিকতা, জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশ এবং বৈধ মতপ্রকাশের পরিসর সুরক্ষিত থাকবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, নিরাপদ ডিজিটাল বাংলাদেশ ও স্বাধীন গণমাধ্যম পরস্পরের প্রতিপক্ষ নয়। সঠিক আইন ও যথাযথ সুরক্ষার মাধ্যমে দুটিকে একসঙ্গে শক্তিশালী করা সম্ভব।
//ডিবিটেক/ডিএসটিপিআর/এসএমপি/এমআইএসটি//





