জন্ম থেকেই এক পরিচয়, এক ওয়ালেটের পথে বাংলাদেশ

ছয় মাসে চূড়ান্ত হবে ওয়ান-আইডির রূপরেখা

  • ছয় মাসে এক নাগরিক, এক আইডি, এক ওয়ালেটের রূপরেখা চূড়ান্ত
  • জন্মের পরই মিলবে স্থায়ী ও স্বতন্ত্র ডিজিটাল পরিচয়
  • ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার ডি-স্টার প্রকল্পে বিশ্বব্যাংকের ঋণ

ছয় মাসে চূড়ান্ত হবে ওয়ান-আইডির রূপরেখা
৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১৭:৪৭  

জন্মের পরই দেশের প্রতিটি নাগরিককে একটি স্থায়ী ও স্বতন্ত্র ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ‘ইউনিফায়েড ডিজিটাল আইডেনটিটি’ বা ‘এক-আইডি’ নামে প্রস্তাবিত এই পরিচয়পত্রই একজন নাগরিকের আজীবনের প্রধান পরিচয় হিসেবে ব্যবহারের পরিকল্পনা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সরকারি বিভিন্ন সেবাসহ নাগরিক জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এই পরিচয় ব্যবহার করা হবে।

তবে উদ্যোগটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়সীমা জানিয়েছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। ৩ সেপ্টেম্বর আইসিটি টাওয়ারে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি ও ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ প্রকল্পের ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল বা ডিপিপি প্রণয়নের কাজ দ্রুত এগোচ্ছে এবং আগামী ছয় মাসের মধ্যে এর বাস্তবায়নের রূপরেখা চূড়ান্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, নাগরিক সেবা এক ছাতার নিচে আনতে সরকার একটি বৃহৎ পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি ও ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ উদ্যোগটি সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল অবকাঠামো প্রকল্প।

এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে ফকির মাহবুব আনামের বক্তব্যও এসেছে যে প্রকল্পটির ডিপিপি দ্রুত শেষ করে ছয় মাসের মধ্যে পরবর্তী পর্যায়ে নেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।

জন্মের পরই ডিজিটাল পরিচয়
তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এই ধারণাটির ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’। অর্থাৎ একজন নাগরিকের একটি কার্ড থাকবে। সেটিই হবে তাঁর ডিজিটাল পরিচয় এবং এর মাধ্যমে তিনি ডিজিটাল লেনদেন করতে পারবেন।

তবে নতুন পরিচয়পত্রে ঠিক কোন কোন তথ্য থাকবে, তা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, সিঙ্গাপুর, এস্তোনিয়া ও ভারতের একক পরিচয় ব্যবস্থার অভিজ্ঞতাও রয়েছে।

তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মামুনুর রশীদ ভূঞা জানান, দেশে এখন অনেক ধরনের কার্ড থাকলেও সেগুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। কারও দুটি জন্মনিবন্ধন কার্ড, কারও দুটি পাসপোর্ট রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে “নতুন পরিচয়পত্র হবে একক ও স্থায়ী। নতুন জন্ম নেওয়া একটি শিশুও এই কার্ড পাবে। আর কোনো কার্ডের প্রয়োজন হবে না।”

বর্তমানে জন্মের পর শিশুদের জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়া হয়। ১৮ বছর বয়স হলে জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি পাওয়া যায়। প্রস্তাবিত এক-আইডি ব্যবস্থায় জন্মের পরই নাগরিকের ডিজিটাল পরিচয় তৈরি হবে এবং সারা জীবন স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য সেবা পেতে সেটিই ব্যবহার করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এর ফলে সরকারি দফতরে একই নাগরিককে একই তথ্য বারবার দিতে হবে না।

এনআইডি-ফ্যামিলি কার্ডও এক ব্যবস্থায়
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ বলছে, একক পরিচয়পত্র চালু হলে ধীরে ধীরে বিদ্যমান অন্যান্য কার্ডের কার্যকারিতা থাকবে না। জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো কার্ডের মাধ্যমে পাওয়া সেবাগুলো নতুন এক-আইডি ব্যবস্থায় যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো সবকিছু চূড়ান্ত হয়নি।

বর্তমানে দেশে এনআইডি, জন্মনিবন্ধন, পাসপোর্ট, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং কর শনাক্তকরণ নম্বর বা টিআইএনসহ বিভিন্ন পরিচয়পত্র ও নম্বর চালু আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব তথ্যভান্ডারের মধ্যে কার্যকর আন্তঃসংযোগ তৈরি করা গেলে নাগরিকের একই তথ্য বারবার সংগ্রহের প্রয়োজন কমবে। এতে নাগরিকের ভোগান্তিও কমতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের ডি-স্টার প্রকল্পের নথিতেও ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থার আন্তঃসংযোগ, তথ্য বিনিময় ও ডিজিটাল সরকারি অবকাঠামো শক্তিশালী করার বিষয়গুলোকে প্রকল্পের অংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার প্রকল্প
স্থায়ী ও স্বতন্ত্র পরিচয়পত্র তৈরির জন্য তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ ‘ডিজিটাল সার্ভিস ট্রান্সফরমেশন ফর অ্যাকসেস অ্যান্ড রেজিলিয়েন্স’ বা ডি-স্টার প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল। প্রস্তাবিত সময়কাল ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল। অনুমোদনের প্রক্রিয়ার জন্য প্রকল্পটি পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে।

প্রাথমিক প্রকল্প প্রস্তাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ জনশুমারির তথ্যের ভিত্তিতে দেশের প্রায় ১৮ কোটি নাগরিকের জন্য পরিচয়পত্র তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে। তবে কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণ করা হবে ২০ কোটি।

প্রতিটি পলিকার্বোনেট চিপ কার্ড উৎপাদন ও মুদ্রণে ব্যয় ধরা হয়েছে ২ মার্কিন ডলার, যা বর্তমান হিসাবে প্রায় ২৪৬ টাকা। প্রতিটি কার্ড বিতরণ ও সরবরাহে আরও ১ ডলার বা প্রায় ১২৩ টাকা ব্যয় ধরা হয়েছে। ফলে উৎপাদন, মুদ্রণ, বিতরণ ও সরবরাহ মিলিয়ে প্রতিটি কার্ডের ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ৩৬৯ টাকা।
প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকার দেবে ৭ হাজার ৬৬৩ কোটি টাকা এবং বিশ্বব্যাংকের ঋণ থেকে আসবে ১ হাজার ৫৩০ কোটি টাকা।

সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হবে কার্ড উৎপাদন, মুদ্রণ, বায়োমেট্রিক বা আঙুলের ছাপের তথ্য সংগ্রহ এবং কার্ড বিতরণে। এ খাতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা।

বিশ্বব্যাংকের প্রকাশিত ডি-স্টার নথিতে প্রকল্পটির বৃহত্তর লক্ষ্য হিসেবে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও স্থিতিস্থাপক ব্রডব্যান্ড এবং ডিজিটাল সেবার ব্যবহার বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। ডিজিটাল সরকারি অবকাঠামো, তথ্য বিনিময় ও ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থার আন্তঃসংযোগও এর সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে।

এক কার্ডে ফ্যামিলি ও কৃষক সেবা
বর্তমান সরকারের পরিকল্পনায় নাগরিকদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, স্বাস্থ্য কার্ড, প্রবাসী কার্ড ও কৃষক কার্ড দেওয়ার কথাও রয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড তৈরি ও তথ্য সংগ্রহে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৯০৬ কোটি টাকা। কৃষক কার্ড দিতে ব্যয় হবে ৬৮১ কোটি টাকা। তবে প্রবাসী কার্ড ও স্বাস্থ্য কার্ডে কত টাকা ব্যয় হবে, তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি।
এক-আইডি ধারণার সঙ্গে এসব কার্ডের সেবাকে ভবিষ্যতে একটি একক ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে কোন কার্ডের কোন সেবা কীভাবে এক-আইডির সঙ্গে যুক্ত হবে, সে বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি।

অর্থসংকটের মধ্যেও বড় বিনিয়োগ
সরকারের বর্তমান অর্থসংকটের মধ্যে ৯ হাজার ১৯৩ কোটি টাকার এক-আইডি প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা ও ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কেউ কেউ বলছেন, বিভিন্ন খাতে সরকারের বিপুল ব্যয়ের চাপ রয়েছে, অথচ রাজস্ব আদায় কম। ফলে এ সময়ে এত বড় প্রকল্পে ব্যয় করা কতটা বাস্তবসম্মত, তা বিবেচনা করা প্রয়োজন।

অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করছেন, প্রকল্পটি পাঁচ বছর ধরে বাস্তবায়িত হবে। ফলে ভবিষ্যতে সরকারের আর্থিক সংকট বর্তমানের মতো নাও থাকতে পারে।
এই বিতর্কের মধ্যেই সরকারের তাৎক্ষণিক লক্ষ্য এখন ডিপিপি চূড়ান্ত করা। মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসের মধ্যে এক নাগরিক, এক ডিজিটাল পরিচয় ও এক ডিজিটাল ওয়ালেট ব্যবস্থার বাস্তবায়ন কাঠামোর রূপরেখা চূড়ান্ত হওয়ার কথা।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এসএমই/এমআইএস//