১৮০ দিনে প্রযুক্তি খাতে সরকারের অগ্রগতি
সংযোগ, স্টার্টআপ ও অবকাঠামোয় নতুন উদ্যোগ
- ১৮০ দিনে প্রযুক্তি অবকাঠামো, সংযোগ ও স্টার্টআপে নানা উদ্যোগ
- ডাক ও ডিজিটাল সেবায় আধুনিকায়নের পরিকল্পনা
- ছয় মাসে ওয়ান-আইডির রূপরেখা, রূপপুরে কারিগরি চ্যালেঞ্জ
দায়িত্ব গ্রহণের পর দ্বিতীয়বার গণমাধ্যমকর্মীদের মুখোমুখি হয়ে সরকারের গত ১৮০ দিনের প্রযুক্তি খাতের অগ্রগতি, চলমান প্রকল্প ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। ৩ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার দুপুরে আগারগাঁওয়ের আইসিটি টাওয়ারে তথ্য ও প্রযুক্তি বিভাগের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব তথ্য তুলে ধরেন।
সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ এবং আইসিটি সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা।
সরকারের ১৮০ দিনের অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে সংবাদ সম্মেলনে প্রযুক্তি অবকাঠামো সম্প্রসারণ, স্টার্টআপে বিনিয়োগ, সাইবার নিরাপত্তা, টেলিটকের নেটওয়ার্ক উন্নয়ন, তৃতীয় সাবমেরিন কেবল প্রকল্প, ডাক বিভাগের আধুনিকায়ন এবং নাগরিক সেবা ডিজিটাল কাঠামোর আওতায় আনার বিভিন্ন উদ্যোগের কথা জানানো হয়।
স্টার্টআপে ৫০০ কোটি টাকার তহবিল
দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমকে চাঙ্গা করতে ৫০০ কোটি টাকার তহবিল থেকে কাজ শুরু হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত বিশেষ আয়োজনের পর তিনটি সম্ভাবনাময় প্রযুক্তিনির্ভর স্টার্টআপে ইতোমধ্যে ৭ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে।
সরকারের এই উদ্যোগের লক্ষ্য প্রযুক্তিনির্ভর নতুন ব্যবসা, উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির পরিধি বাড়ানো।
বাড়ছে ডিজিটাল সংযোগ
গত ১৮০ দিনের প্রযুক্তি অবকাঠামোগত অগ্রগতির তথ্য তুলে ধরে জানানো হয়, দেশের ১৯ হাজার ৮২২টি প্রতিষ্ঠানে ব্রডব্যান্ড সংযোগ দেওয়া হয়েছে। একই সময়ে ১৫টি উপজেলায় প্রশিক্ষণ কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়েছে।
পার্বত্য অঞ্চলের ১০২টি স্কুলে লো আর্থ অরবিট বা এলইও স্যাটেলাইটের মাধ্যমে দূরবর্তী সেবা দেওয়া হচ্ছে। দুর্গম ও সংযোগ-সীমিত এলাকায় স্যাটেলাইটভিত্তিক প্রযুক্তি ব্যবহারের এই উদ্যোগকে ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
পাবলিক ট্রান্সপোর্টে ডিজিটাল সংযোগ বাড়াতে একটি বিমানবন্দর, ছয়টি রেলওয়ে স্টেশন এবং চারটি আন্তঃনগর ট্রেনে ফ্রি ওয়াইফাই চালু করা হয়েছে।
টেলিটকে নতুন ৩০০ সাইট
রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটকের নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণেও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। গত ১৮০ দিনে ৩০০টি নতুন নেটওয়ার্ক সাইট স্থাপন করা হয়েছে।
এ ছাড়া টেলিটকে ভয়েস ওভার ওয়াইফাই বা VoWiFi এবং ভয়েস ওভার এলটিই বা VoLTE প্রযুক্তির ট্রায়াল চালানো হচ্ছে। নতুন প্রযুক্তিগুলোর মাধ্যমে মোবাইল নেটওয়ার্কের আওতা ও ভয়েস সেবার মান উন্নত করার লক্ষ্য রয়েছে।
তৃতীয় সাবমেরিন কেবলে যন্ত্রপাতি স্থাপন
দেশের আন্তর্জাতিক ইন্টারনেট সংযোগ সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে কক্সবাজারে তৃতীয় সাবমেরিন কেবল প্রকল্পের ল্যান্ডিং স্টেশনের যন্ত্রপাতি স্থাপন সম্পন্ন হয়েছে বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
তৃতীয় সাবমেরিন কেবল চালু হলে আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ সক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের ইন্টারনেট অবকাঠামোর স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি হবে।
সাইবার নিরাপত্তায় আইনি সংস্কার
তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সুশাসন ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গত ছয় মাসে বেশ কিছু আইনি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান মন্ত্রী।
সংবাদ সম্মেলনে সাইবার নিরাপত্তা আইন, ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা আইন এবং জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা আইনের খসড়া জাতীয় সংসদে অনুমোদিত হওয়ার কথা জানানো হয়।
সাইবার নিরাপত্তা জোরদারে ন্যাশনাল রেডি সিস্টেম, সাইবার ইনসিডেন্ট রিপোর্টিং সিস্টেম এবং জাতীয় সাইবার ড্রিল ২০২৪ চালুর কথাও তুলে ধরা হয়।
আধুনিকায়ন হচ্ছে ডাক বিভাগ
ডাক বিভাগকে আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে প্রায় ৯ হাজার ডাকঘর পুনর্গঠনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
বিগত আম মৌসুমে ডাক বিভাগের নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে প্রায় ৩৫০ টন আম সরবরাহ করা হয়েছে। ই-কমার্সের প্রসেসিং সহজ করতে ১৪টি ফুলফিলমেন্ট সেন্টার চালু করা হয়েছে।
এ ছাড়া দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নাগরিকদের জন্য ‘বাংলা স্ক্রিন রিডার’ এবং যশোরে একটি ডিজাস্টার রিকভারি সেন্টার স্থাপনের বিষয়টিও সংবাদ সম্মেলনে তুলে ধরা হয়।
প্রযুক্তি অবকাঠামোর পাশাপাশি এসব উদ্যোগের মাধ্যমে ডাক বিভাগের প্রচলিত সেবাকে ডিজিটাল ও ই-কমার্সভিত্তিক অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও উঠে আসে।
ছয় মাসে ওয়ান-আইডির রূপরেখা
নাগরিক সেবা এক ছাতার নিচে আনতে সরকারের বৃহৎ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি ও ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ উদ্যোগের কথা জানান মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম।
তিনি বলেন, প্রকল্পটির ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল বা ডিপিপি প্রণয়নের কাজ দ্রুতগতিতে চলছে এবং আগামী ছয় মাসের মধ্যে এর বাস্তবায়নের রূপরেখা চূড়ান্ত হবে।
তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ উদ্যোগটির ধারণা ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’, অর্থাৎ একজন নাগরিকের একটি কার্ড থাকবে। সেটি হবে তাঁর ডিজিটাল পরিচয় এবং তা দিয়ে তিনি ডিজিটাল লেনদেন করতে পারবেন।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, জন্মের পরই নাগরিককে একটি স্থায়ী ও স্বতন্ত্র ডিজিটাল পরিচয় দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অন্যান্য সরকারি সেবা গ্রহণে সারা জীবন এই পরিচয় ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে।
আইসিটি সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা বলেন, দেশে এখন অনেক ধরনের কার্ড থাকলেও সমন্বয়হীনতা রয়েছে। কারও দুটি জন্মনিবন্ধন কার্ড, কারও দুটি পাসপোর্ট রয়েছে।
তিনি বলেন, “নতুন পরিচয়পত্র হবে একক ও স্থায়ী। নতুন জন্ম নেওয়া একটি শিশুও এই কার্ড পাবে। আর কোনো কার্ডের প্রয়োজন হবে না।”
বর্তমানে জন্মের পর শিশুদের জন্মনিবন্ধন সনদ দেওয়া হয় এবং ১৮ বছর বয়স হলে জাতীয় পরিচয়পত্র বা এনআইডি দেওয়া হয়। প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় জন্মের পরই পরিচয় তৈরি হবে। নতুন পরিচয়পত্র পাওয়ার পর সরকারি দফতরে নাগরিককে একই তথ্য বারবার দেওয়ার প্রয়োজন হবে না।
তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগ জানিয়েছে, একক পরিচয়পত্র চালু হলে ধীরে ধীরে বিদ্যমান অন্যান্য কার্ডের কার্যকারিতা থাকবে না। এনআইডি, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডের মতো কার্ডের সেবাগুলো নতুন পরিচয়পত্রে যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি।
রূপপুরে কারিগরি চ্যালেঞ্জ
সংবাদ সম্মেলনের শেষের দিকে দেশের সবচেয়ে বড় প্রযুক্তি ও প্রকৌশল অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর একটি রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অগ্রগতি ও চ্যালেঞ্জের বিষয়ও উঠে আসে।
মন্ত্রী জানান, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ইতোমধ্যে ফুয়েল লোডিং সম্পন্ন হয়েছে। আগামী চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে কেন্দ্রটি চালুর চূড়ান্ত ধাপে কিছু কারিগরি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে বলে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, প্রকল্পের ‘ক্রিটিক্যাল স্টেজ’ বা বি, বি-১ ও সি পর্যায়ের প্রেসার ভালভ বা বাল্বজনিত জটিলতার কারণে পরীক্ষামূলক প্রক্রিয়ায় কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে।
রাশিয়ার পরমাণু সংস্থা রোসাটমের বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞানীরা দেশীয় দলের সঙ্গে যৌথভাবে সমস্যাটি সমাধানে কাজ করছেন বলে জানানো হয়। দ্রুত এই কারিগরি সমস্যা কাটিয়ে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়।
সরকারের গত ১৮০ দিনের প্রযুক্তি খাতের অগ্রগতির সঙ্গে এখন তাই দুটি বড় সময়সীমা সামনে এসেছে—নাগরিক সেবায় ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান ডিজিটাল আইডি, ওয়ান ওয়ালেট’ ব্যবস্থার বাস্তবায়ন কাঠামো আগামী ছয় মাসে চূড়ান্ত করা এবং রূপপুর থেকে আগামী চার থেকে ছয় মাসে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের লক্ষ্য অর্জন।
//ডিবিটেক/জেইউপি/এসএমই/এমএসআই//





