পাঁচ মাসে প্রযুক্তি খাত: অগ্রগতির আলো, সংস্কারের ছায়া

পাঁচ মাসে প্রযুক্তি খাত: অগ্রগতির আলো, সংস্কারের ছায়া
১৯ জুলাই, ২০২৬ ০০:১৩  

বাংলাদেশের প্রযুক্তি খাতের ইতিহাসে কিছু সময় কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তনের নয়, নীতিগত মোড় ঘোরানোরও সাক্ষী হয়ে থাকে। ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত পাঁচ মাসকে তেমন একটি সময় বলেই বিবেচনা করা যেতে পারে। এই সময়ের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো—ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি—দুটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের নীতিগত কার্যক্রম একই নেতৃত্বের অধীনে এনে সমন্বিত সংস্কারের চেষ্টা।

মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনামের নেতৃত্ব এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদের নীতিগত সহায়তায় প্রযুক্তি, টেলিযোগাযোগ ও বিজ্ঞান খাতে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সময়ে কিছু মৌলিক সংস্কার এখনও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। ফলে পাঁচ মাসের মূল্যায়নে যেমন সাফল্যের গল্প আছে, তেমনি রয়েছে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও।

প্রথমেই ইতিবাচক দিকগুলো দেখা যাক।

নতুন জাতীয় বাজেটে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। তরুণদের জন্য ৫০০ কোটি টাকার ফ্রিল্যান্সার তহবিল, গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি, বিজ্ঞান গবেষণায় নতুন অর্থায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা তৈরির উদ্যোগ—সবই দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত। কেবল অবকাঠামো নয়, মানবসম্পদে বিনিয়োগের এই প্রবণতা নীতিগতভাবে ইতিবাচক।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে (AI) ঘিরেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত স্পষ্ট। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে এআই ব্যবহারের আলোচনা থাকলেও নীতিগত কাঠামোর অভাব ছিল। এখন মানবকেন্দ্রিক জাতীয় এআই নীতি প্রণয়নের উদ্যোগ, দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের নির্দেশিকা এবং সরকারি সেবায় এআই ব্যবহারের পরিকল্পনা প্রযুক্তি নীতিকে নতুন মাত্রা দিতে পারে।

ডিজিটাল রাষ্ট্রব্যবস্থার আরেকটি বড় পরিকল্পনা "ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান আইডি"। নাগরিকের বিভিন্ন পরিচয়পত্র, সরকারি সেবা এবং ডিজিটাল ওয়ালেটকে একটি সমন্বিত পরিচয় কাঠামোর আওতায় আনার এই উদ্যোগ সফল হলে সরকারি সেবার গতি বাড়বে, জালিয়াতি কমবে এবং সেবার পুনরাবৃত্তি হ্রাস পাবে। তবে এর সফলতা সম্পূর্ণ নির্ভর করবে শক্তিশালী ডেটা গভর্ন্যান্স এবং নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষার ওপর।

এখানেই এসে সামনে আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—ডেটা সুরক্ষা আইন।

ডিজিটাল পরিচয়, স্বাস্থ্যকার্ড, রেশন কার্ড, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, ডিজিটাল ওয়ালেট—সবকিছু যদি একই ডেটা অবকাঠামোর সঙ্গে যুক্ত হয়, তাহলে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা আর কেবল প্রযুক্তিগত বিষয় থাকে না; এটি নাগরিক অধিকার, রাষ্ট্রীয় আস্থা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়।

বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই একটি আধুনিক ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা আইন নিয়ে আলোচনা চলছে। কিন্তু শক্তিশালী, আন্তর্জাতিক মানসম্মত এবং স্বাধীন তদারকি কাঠামো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ডেটা সংগ্রহ যত দ্রুত বাড়ছে, আইনি সুরক্ষা সেই গতিতে এগোয়নি। ফলে নতুন বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রজন্মে প্রবেশ করতে হলে ডেটা সুরক্ষা আইন বাস্তবায়ন এখন আর বিলাসিতা নয়, অপরিহার্যতা।

একইভাবে সাইবার নিরাপত্তাও এখন জাতীয় নিরাপত্তার অংশ।

সরকারি ডেটাবেজ, হাসপাতাল, ব্যাংক, টেলিকম নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, বিমানবন্দর, স্মার্ট সেবা—সবকিছুই ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। ফলে সাইবার আক্রমণ শুধু তথ্য চুরি নয়; এটি অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় সেবা এবং জননিরাপত্তার ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে। জাতীয় সাইবার নিরাপত্তা সক্ষমতা, সিকিউরিটি অপারেশন সেন্টার, দক্ষ জনবল এবং সমন্বিত প্রতিরক্ষা কাঠামো গড়ে তোলা তাই সমান গুরুত্বপূর্ণ।

টেলিযোগাযোগ খাতেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি দেখা গেছে।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল, উপকূল, চরাঞ্চল ও পার্বত্য এলাকায় স্যাটেলাইটভিত্তিক সংযোগ সম্প্রসারণ, বিমানবন্দর রেলস্টেশনে বিনামূল্যে ওয়াই-ফাই, ক্লাউড ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণ এবং ভবিষ্যৎ ৫জি অবকাঠামোর প্রস্তুতি ইতিবাচক বার্তা দেয়।

কিন্তু প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে যে বিষয়টি, সেটি হলো ৭০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রাম।

বিশ্বব্যাপী ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডকে ৫জি এবং গ্রামীণ ব্রডব্যান্ড বিস্তারের সবচেয়ে কার্যকর ফ্রিকোয়েন্সি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কম সংখ্যক টাওয়ারে বেশি এলাকা কভার করার সক্ষমতার কারণে এটি বাংলাদেশের মতো ভৌগোলিক বাস্তবতায় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ফলে এই স্পেকট্রামের বণ্টন, মূল্য নির্ধারণ, ব্যবহার এবং প্রতিযোগিতামূলক নীতি আগামী দশকের ডিজিটাল অর্থনীতিকে প্রভাবিত করবে। 

এই জায়গায় এসে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)-এর ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বিটিআরসি কেবল লাইসেন্স প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান নয়; এটি বাজার প্রতিযোগিতা, ভোক্তা অধিকার, স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা এবং বিনিয়োগ পরিবেশের প্রধান নিয়ন্ত্রক। কিন্তু বহু বছর ধরেই কমিশনের স্বাধীনতা, নীতিগত ধারাবাহিকতা, লাইসেন্সিং প্রক্রিয়া এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

নতুন সরকার বিটিআরসিকে আরও কার্যকর ও স্বাধীন করার অঙ্গীকার করেছে। তবে বাস্তব পরিবর্তন নির্ভর করবে কমিশনের প্রশাসনিক সক্ষমতা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর।

একইভাবে জাতীয় টেলিকম নীতিও এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুখে।

নতুন টেলিকম আইন কার্যকর হলেও সংশ্লিষ্ট গাইডলাইন, লাইসেন্সিং কাঠামো, স্পেকট্রাম নীতি, নেটওয়ার্ক শেয়ারিং, অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং নতুন প্রযুক্তি বাস্তবায়নের নির্দেশিকা এখনও পুরোপুরি চূড়ান্ত হয়নি। বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে স্থিতিশীল নীতিগত পরিবেশ চান। নীতির অনিশ্চয়তা বিনিয়োগের গতি কমিয়ে দিতে পারে।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অতীতের জবাবদিহিতা।

বিগত সময়ে টেলিকম ও তথ্যপ্রযুক্তি খাতে অনিয়ম, লাইসেন্স বাণিজ্য, প্রকল্প ব্যয় এবং স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা নিয়ে শ্বেতপত্র প্রকাশেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। সংস্কার কেবল নতুন প্রকল্প গ্রহণে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না; অতীতের অনিয়মের স্বচ্ছ মূল্যায়ন এবং দায় নির্ধারণও সমান গুরুত্বপূর্ণ।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতেও ইতিবাচক পরিবর্তনের ইঙ্গিত রয়েছে। গবেষণা অনুদান বৃদ্ধি, বিজ্ঞান সপ্তাহ আয়োজন, গবেষণা প্রতিষ্ঠানে অর্থায়ন এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে জ্বালানি লোডিং সম্পন্ন হওয়া দেশের বৈজ্ঞানিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

সব মিলিয়ে গত পাঁচ মাসে প্রযুক্তি খাতের যাত্রাপথে আশাবাদের যথেষ্ট কারণ রয়েছে। তবে এই অগ্রযাত্রার স্থায়িত্ব নির্ভর করবে চারটি বিষয়ের ওপর—প্রথমত, শক্তিশালী ডেটা সুরক্ষা আইন; দ্বিতীয়ত, সমন্বিত সাইবার নিরাপত্তা; তৃতীয়ত, দ্রুত ও স্বচ্ছ টেলিকম নীতিমালা বাস্তবায়ন; এবং চতুর্থত, বিটিআরসির প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।

প্রযুক্তি খাতের ইতিহাস বলছে, বড় পরিবর্তন কেবল নতুন প্রকল্প দিয়ে আসে না; আসে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ নীতি এবং নাগরিকের আস্থার মাধ্যমে। গত পাঁচ মাসে সরকার সেই যাত্রার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে। এখন প্রয়োজন সেই ভিত্তির ওপর একটি কার্যকর, নিরাপদ, প্রতিযোগিতামূলক এবং জবাবদিহিতামূলক ডিজিটাল রাষ্ট্র নির্মাণ।

দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।