ওটিপির বিকল্প পাসকি: ডিজিটাল লেনদেনে নিরাপত্তা ও গতির নতুন দিগন্ত
বাংলাদেশে ডিজিটাল লেনদেনের পরিধি দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে ইন্টারনেট ব্যাংকিং ও কার্ডের মাধ্যমে প্রতি মাসে গড়ে ৪৫ থেকে ৫০ হাজার কোটি টাকার লেনদেন সম্পন্ন হচ্ছে। তবে এই প্রবৃদ্ধির সমান্তরালে বড় হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে সাইবার প্রতারণা ও ডিজিটাল জালিয়াতি। দীর্ঘদিন ধরে কেনাকাটা বা বিল পরিশোধে নিরাপত্তাবলয় হিসেবে ব্যবহৃত ৬ ডিজিটের ওটিপি (One-Time Password) এখন নানা ধরনের প্রযুক্তিগত ও সামাজিক ঝুঁকিতে পড়েছে।
দেশীয় ও বৈশ্বিক সাইবার নিরাপত্তা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আর্থিক খাতে সংঘটিত ডিজিটাল ফ্রডের প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশই ঘটে ওটিপি চুরি কিংবা ভুয়া পরিচয়ে ফোন দিয়ে সংবেদনশীল তথ্য হাতিয়ে নেওয়ার (সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) মাধ্যমে। এছাড়া দুর্বল মোবাইল নেটওয়ার্ক বা এসএমএস পৌঁছাতে বিলম্বের কারণে অন্তত ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ই-কমার্স লেনদেন পেমেন্ট ধাপেই আটকে যায় এবং গ্রাহকরা তা বাতিল করতে বাধ্য হন।
এই দ্বিমুখী সংকট কাটাতে আন্তর্জাতিক পেমেন্ট নেটওয়ার্ক ভিসা (Visa) বাংলাদেশে ‘ভিসা পেমেন্ট পাসকি’ (Visa Payment Passkey) প্রযুক্তি চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিষ্ঠানটির বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটানের কান্ট্রি ম্যানেজার সাব্বির আহমেদ জানান, এ পদ্ধতির মূল লক্ষ্য হলো এসএমএস-ভিত্তিক ওটিপির ওপর অতিনির্ভরশীলতা দূর করা। এর ফলে গ্রাহক নিজের ডিভাইসের ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ফেস আইডি কিংবা ডিভাইসের বায়োমেট্রিক/পিন ব্যবহার করে চোখের পলকে লেনদেন সম্পন্ন করতে পারবেন।
পাসকি প্রযুক্তির কর্মপদ্ধতি ও বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা
আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি মান সংস্থা ফাইডো অ্যালায়েন্স (FIDO Alliance) এবং ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব কনসোর্টিয়াম (W3C)-এর পাবলিক-কি ক্রিপ্টোগ্রাফির (Public-Key Cryptography) ওপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে এই পাসকি ব্যবস্থা। সাধারণ নিয়মে ব্যাংকের এসএমএসের জন্য অপেক্ষা করতে হলেও পাসকিতে কোনো ম্যানুয়াল কোড প্রবেশ করাতে হয় না।
গ্রাহক যখন প্রথমবার কোনো ডিভাইসে সেবাটি সক্রিয় করেন, তখন ফোনের সুরক্ষিত হার্ডওয়্যার অংশ ‘সিকিউর এনক্লেভ’-এ একটি ইউনিক ক্রিপ্টোগ্রাফিক প্রাইভেট কি (Private Key) সংরক্ষিত হয়। লেনদেনের সময়ে পেমেন্ট গেটওয়ে ও ব্যাংকিং সিস্টেমের সঙ্গে এটি ব্যাক-এন্ডে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য যাচাই করে নেয়। গ্রাহক কেবল নিজের আঙুলের ছাপ বা ফেস আইডি স্পর্শ করেই পেমেন্ট অনুমোদন করেন।
বিশ্বজুড়ে বর্তমানে ৩০০ কোটিরও বেশি অ্যাকাউন্টে পাসকি ব্যবহৃত হচ্ছে। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের দেশগুলোতে এই ব্যবস্থা চালুর পর দেখা গেছে, নেটওয়ার্কজনিত কারণে লেনদেন বাতিলের হার প্রায় ৭০ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং ওটিপি-কেন্দ্রিক জালিয়াতি নেমে এসেছে শূন্যের কোঠায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক ও ডেটা সুরক্ষানীতির সামঞ্জস্য
বাংলাদেশে যেকোনো ডিজিটাল লেনদেনে দ্বি-স্তরবিশিষ্ট নিরাপত্তা বা টু-ফ্যাক্টর অথেনটিকেশন (2FA) নিশ্চিত করা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুস্পষ্ট নির্দেশনার অংশ। পাসকি প্রযুক্তি গ্রাহকের নিজস্ব ডিভাইসকে প্রথম উপাদান (Possession) এবং বায়োমেট্রিক বা পিনকে দ্বিতীয় উপাদান (Inherence) হিসেবে গ্রহণ করায় এটি বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশিকার সঙ্গে শতভাগ সঙ্গতিপূর্ণ।
পাশাপাশি দেশের উপাত্ত সুরক্ষা নীতিমালা অনুযায়ী, নাগরিকদের সংবেদনশীল আর্থিক বা বায়োমেট্রিক তথ্য দেশের সীমানার বাইরে পাঠানো কিংবা কোনো সাধারণ ব্যাংকিং ক্লাউড সার্ভারে সংরক্ষণ করা নিষিদ্ধ। পাসকির বড় বিশেষত্ব হলো, গ্রাহকের আঙুলের ছাপ বা ফেস আইডির মূল ডেটা কখনো ব্যাংকের সার্ভার বা ইন্টারনেটে সঞ্চালিত হয় না; এটি সংরক্ষিত থাকে কেবল ব্যবহারকারীর নিজস্ব ডিভাইসের এনক্রিপ্টেড মেমরিতে। ফলে নীতিগত ও আইনগতভাবেও এটি সম্পূর্ণ নিরাপদ।
লেনদেনে গতি ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব
ই-কমার্স খাতের সমীক্ষা অনুযায়ী, ওটিপির মাধ্যমে কেনাকাটার অর্থ পরিশোধ করতে একজন গ্রাহকের গড়ে ৩০ থেকে ৪৫ সেকেন্ড সময় লাগে। অন্যদিকে পাসকির মাধ্যমে মাত্র ৫ থেকে ৭ সেকেন্ডেই পুরো প্রক্রিয়া শেষ হয়ে যায়।
এই সময় সাশ্রয় অর্থনৈতিকভাবে বিপুল তাৎপর্য বহন করে। ওটিপি জটিলতার কারণে যে বিপুল পরিমাণ অনলাইন কেনাকাটা মাঝপথে বাতিল হয়ে যেত (Cart Abandonment), তা সফল হলে দেশীয় ই-কমার্স খাতের বার্ষিক টার্নওভার এক লাফে বহুগুণ বাড়বে। সরকারের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি পাবে এবং কাগুজে নোটের ব্যবহার হ্রাস পেয়ে ক্যাশলেস অর্থনীতির পরিধি সম্প্রসারিত হবে।
গ্রাহকের দিক থেকেও সবচেয়ে বড় স্বস্তি—প্রতারকরা দূর থেকে ফোন করে কোনোভাবেই বায়োমেট্রিক ডেটা হাতিয়ে নিতে পারবে না। ফলে ওটিপি বা পিন চাওয়ার যে প্রতারণার ফাঁদ সমাজে চেপে বসেছে, তা সম্পূর্ণ অকার্যকর হয়ে পড়বে। এছাড়া প্রবাসী কিংবা বিদেশে ভ্রমণরত বাংলাদেশিরা রোমিং নেটওয়ার্ক ছাড়াই কেবল ইন্টারনেট সংযোগ দিয়ে সহজে পেমেন্ট সম্পন্ন করতে পারবেন।
বাস্তবায়নের চ্যালেঞ্জ ও কারিগরি সীমাবদ্ধতা
উন্নত সুরক্ষা কাঠামো সত্ত্বেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তিটির কিছু দৃশ্যমান চ্যালেঞ্জ রয়েছে:
-
ডিভাইস চুরির ঝুঁকি: কোনো গ্রাহকের হ্যান্ডসেট চুরি হলে এবং অপরাধী যদি কৌশলে ডিভাইসের পিন বা স্ক্রিন লক আগেই জেনে ফেলে, তবে ওটিপি ছাড়াই কার্ড ব্যবহারের একটি তাত্ত্বিক ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
-
সাশ্রয়ী হ্যান্ডসেটের সীমাবদ্ধতা: দেশের একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠীর হাতে এখনো আধুনিক বায়োমেট্রিক সেন্সর বা ফাইডো সাপোর্টহীন পুরোনো হ্যান্ডসেট কিংবা বেসিক ফিচার ফোন রয়েছে। এই প্রযুক্তি থেকে তারা তাৎক্ষণিকভাবে বঞ্চিত হতে পারেন।
-
ব্যাংকগুলোর প্রস্তুতি ও বড় বিনিয়োগ: ভিসা পাসকির আধুনিক এপিআই যুক্ত করতে দেশের ব্যাংকগুলোকে তাদের প্রথাগত কোর-ব্যাংকিং ও পেমেন্ট সফটওয়্যার আর্কিটেকচারে বড় সংস্কার আনতে হবে, যা বেশ ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ।
-
ব্যবহারকারীর মনস্তাত্ত্বিক দ্বিধা: বহুদিনের অভ্যস্ত ওটিপি ব্যবস্থা ছেড়ে নতুন পদ্ধতিতে অভ্যস্ত হতে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে শুরুতে কিছুটা সংশয় ও আস্থার ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
ভবিষ্যতের পথরেখা
২০২৭ সালের মধ্যে দেশের সিংহভাগ খুচরা লেনদেন ডিজিটাল করার যে জাতীয় লক্ষ্য কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারণ করেছে, ভিসার পাসকি চালুর উদ্যোগ সেই যাত্রায় একটি বড় রূপান্তর। তবে এই উদ্যোগের পূর্ণ সুফল পেতে বাংলাদেশ ব্যাংককে দ্রুত সুনির্দিষ্ট ডেটা সিকিউরিটি ও ডিভাইস ম্যানেজমেন্ট গাইডলাইন জারি করতে হবে।
একইসঙ্গে যেসব গ্রাহক এখনো ফিচার ফোন বা পুরোনো হ্যান্ডসেট ব্যবহার করছেন, তাদের জন্য সমান্তরালভাবে ওটিপি সুবিধা চালু রাখতে হবে; অন্যদিকে আধুনিক স্মার্টফোন ব্যবহারকারীদের ধীরে ধীরে পাসকিতে অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। কার্যকর নিয়ন্ত্রণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও জনসচেতনতা নিশ্চিত করা গেলে এই প্রযুক্তি বাংলাদেশের ফিনটেক ইকোসিস্টেমকে বিশ্বমানের আধুনিক ও সুরক্ষিত করে তুলবে।
লেখকঃ ই-কমার্স বিশ্লেষক এবং প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য, ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ই-ক্যাব)।





