জলবায়ু-স্বাস্থ্য খাতে বাজেট অংশীদারিত্ব নেমেছে ১.৯৭ শতাংশে

জলবায়ু স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি

জলবায়ু স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি
৬ জুন, ২০২৬ ১৩:০৬  
৬ জুন, ২০২৬ ১৮:২২  

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাড়তে থাকা স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলায় প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যব্যবস্থা, রোগ নজরদারি, তথ্যভিত্তিক গবেষণা এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন নীতিনির্ধারক, গবেষক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন, জলবায়ুজনিত রোগ, মাতৃস্বাস্থ্য সংকট, নিরাপদ পানির অভাব এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ মোকাবিলায় ডিজিটাল স্বাস্থ্য প্রযুক্তি, ডেটা অ্যানালিটিক্স, আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা এবং আধুনিক স্বাস্থ্য অবকাঠামো এখন সময়ের অপরিহার্য চাহিদা। অথচ দেশের স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের মোট বাজেটের মধ্যে জলবায়ু-সংশ্লিষ্ট বরাদ্দের অংশ ২০২১-২২ অর্থবছরের ২.৭৪ শতাংশ থেকে কমে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১.৯৭ শতাংশে নেমে এসেছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট ঘোষণার প্রাক্কালে সেন্টার ফর পার্টিসিপেটরি রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (সিপিআরডি), HEKS/EPER এবং সুশীলনের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত “বাংলাদেশে জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও স্বাস্থ্য অর্থায়ন” শীর্ষক এক উচ্চপর্যায়ের নীতিসংলাপে এ আহ্বান জানানো হয়। ঢাকার ব্র্যাক সেন্টার ইনে ৬ জুন, শনিবার এ সংলাপে জলবায়ু ও স্বাস্থ্য বিষয়ক সাম্প্রতিক গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করা হয়।

অনুষ্ঠানে সিপিআরডি পরিচালিত দুটি গবেষণার ফলাফল তুলে ধরা হয়। গবেষণা দুটি হলো— “উপকূলীয় অঞ্চলের নারী ও কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্যের ওপর জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মূল্যায়ন” এবং “বাংলাদেশে স্বাস্থ্য খাতে জলবায়ু অর্থায়ন: নীতিগত অঙ্গীকার ও আর্থিক বাস্তবতা”।

প্রথম গবেষণাটি উপস্থাপন করেন সোহানুর রহমান ও মো. শাহাদাত হোসেন। গবেষণায় দেখা যায়, দারিদ্র্য, নিরাপদ পানির সংকট এবং জলবায়ুজনিত দুর্যোগের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলের নারীরা গুরুতর প্রজনন ও মাতৃস্বাস্থ্য সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। গবেষণায় অংশ নেওয়া প্রায় অর্ধেক নারী অনিয়মিত মাসিক, তীব্র ব্যথা, মাসিক বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং অস্বাভাবিক রক্তক্ষরণের মতো সমস্যার কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে গর্ভপাত, প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া, সংক্রমণ, প্রসবোত্তর রক্তক্ষরণ এবং দীর্ঘস্থায়ী ব্যথাসহ বিভিন্ন জটিলতার বিষয়ও উঠে এসেছে। অংশগ্রহণকারী ৮২.৫ শতাংশ নারী জানিয়েছেন, নিরাপদ পানি ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসম্মত উপকরণের সীমিত প্রাপ্যতা এসব সমস্যাকে আরও তীব্র করেছে। গবেষণায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারীর মধ্যে পেলভিক ইনফ্ল্যামেটরি ডিজিজ (PID)-এর লক্ষণ এবং বিভিন্ন গাইনোকোলজিক্যাল সংক্রমণের প্রমাণও পাওয়া গেছে।

দ্বিতীয় গবেষণাটি উপস্থাপন করেন সিপিআরডির প্রোগ্রাম ম্যানেজার সুমাইয়া বিনতে আনোয়ার। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জলবায়ু নীতিমালায় স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও সেই প্রতিশ্রুতি এখনো পর্যাপ্ত অর্থায়নে প্রতিফলিত হয়নি। গবেষণায় দেখা যায়, জাতীয় জলবায়ু বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের অংশ FY ২০২১-২২ অর্থবছরে প্রায় ২.৫ শতাংশ থাকলেও FY ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা কমে ১.৫ শতাংশে নেমে এসেছে।

গবেষণায় আরও উঠে আসে যে, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্ট ফান্ড (BCCTF)-এর মোট অর্থায়নের এক শতাংশেরও কম স্বাস্থ্য-সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে বরাদ্দ হয়েছে। ২০২৪ সাল পর্যন্ত BCCTF-এর আওতায় অর্থায়নপ্রাপ্ত ৮৭৭টি প্রকল্পের মধ্যে মাত্র তিনটি স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে।

গবেষণায় জলবায়ু-স্বাস্থ্য অর্থায়নের কয়েকটি কাঠামোগত দুর্বলতাও চিহ্নিত করা হয়েছে। যদিও জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (NAP) ২০২৩-২০৫০ স্বাস্থ্যকে একটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোজন অগ্রাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং স্বাস্থ্য জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (HNAP) অনুযায়ী আগামী পাঁচ বছরে জলবায়ু-সহনশীল স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে, তবুও বিদ্যমান অর্থায়ন এখনো মূলত প্রকল্পনির্ভর।

গবেষণায় দেখা যায়, জলবায়ু-স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৬০ শতাংশের বেশি উন্নয়ন প্রকল্পে কেন্দ্রীভূত। অন্যদিকে রোগ নজরদারি, জরুরি প্রস্তুতি, স্বাস্থ্যকর্মীদের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জলবায়ু-স্বাস্থ্য গবেষণা, ডিজিটাল ডেটা সিস্টেম এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যব্যবস্থার সহনশীলতা গড়ে তোলার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পাচ্ছে না।

নীতিসংলাপ সঞ্চালনা করেন সিপিআরডির প্রধান নির্বাহী মো. শামসুদ্দোহা। তিনি বলেন, জলবায়ু অর্থায়ন এখনো একটি অস্পষ্ট ক্ষেত্র। বৈশ্বিক পর্যায়ে অধিক মনোযোগ ও অর্থায়ন আকর্ষণ করতে হলে শক্তিশালী পরিমাণগত প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি জলবায়ু-স্বাস্থ্য আলোচনাকে শুধু নিরাপদ পানীয় জলের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সব ক্ষেত্রে মানসম্মত পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার দিকে নজর দিতে হবে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের উপসচিব ড. শাহ আবদুল সাদী বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন আহরণের জন্য একটি শক্তিশালী ‘ক্লাইমেট র্যাশনাল’ প্রতিষ্ঠা জরুরি। তিনি জলবায়ু বাজেট ট্যাগিং ব্যবস্থায় সুস্পষ্ট সংজ্ঞা, খাতভিত্তিক মালিকানা, সম্পদ আহরণ এবং ঝুঁকি সূচক উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। একই সঙ্গে জলবায়ু-স্বাস্থ্য বাজেটিং প্রক্রিয়ায় নাগরিক সমাজ, শিক্ষাবিদ ও বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে তৃতীয় পক্ষীয় যাচাই ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ করেন।

স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড হেলথ প্রমোশন ইউনিট (CCHPU)-এর পরিচালক ও কো-অর্ডিনেটর প্রফেসর ড. মো. ইকবাল কবির বলেন, বিশ্বব্যাপী মোট জলবায়ু অর্থায়নের মাত্র ৫ শতাংশ স্বাস্থ্য খাতে আসে। এটি প্রমাণ করে যে জলবায়ু-স্বাস্থ্য এখনো বৈশ্বিক পর্যায়ে অবহেলিত একটি ক্ষেত্র। তিনি বলেন, তথ্য-উপাত্তের ঘাটতি শক্তিশালী অর্থায়ন প্রস্তাব তৈরি এবং তথ্যভিত্তিক নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব ও জাতিসংঘ অনুবিভাগ প্রধান এ কে এম সোহেল আহমেদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বিষয়টি এখনো উন্নয়ন পরিকল্পনায় পুরোপুরি মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তিনি উপকূলীয় অঞ্চলের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাতেও গবেষণা সম্প্রসারণ, তথ্য উৎপাদন এবং জলবায়ু সচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে দ্রুত তথ্যপ্রাপ্তি ও সমন্বয় বাড়াতে একটি ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন।

সংলাপ শেষে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্য জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার (HNAP) অগ্রাধিকারসমূহকে জাতীয় বাজেটে শক্তিশালীভাবে অন্তর্ভুক্ত করা, জলবায়ু বাজেট ট্র্যাকিং ব্যবস্থা উন্নত করা, রোগ নজরদারি ও প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমে পুনরাবৃত্ত অর্থায়ন বৃদ্ধি, ডিজিটাল স্বাস্থ্য অবকাঠামো ও প্রযুক্তিনির্ভর অভিযোজন ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়ানো এবং স্বাস্থ্যখাত-নেতৃত্বাধীন অভিযোজন উদ্যোগের জন্য দেশীয় জলবায়ু অর্থায়নে অধিক প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা।

//ডিবিটেক/এসআই/এমআই//