আজ ঢাকে শেষ চাট্টি, কাল থেকেই সংগ্রাম শুরু

ঢাকা: দেবী দুর্গা ফিরে যাচ্ছেন কৈলাসে। চারদিকে বিষাদের সুর, মণ্ডপে মণ্ডপে বিদায় আয়োজন। দশমীর শেষ মুহূর্তেও মণ্ডপে তুমুল বেজে চলেছে ঢাক। এই মিষ্টি ও গম্ভীর বাদ্যধ্বনি ছাড়া দুর্গাপূজার আবহ কল্পনাই করা যায় না। যে সুর আর ছন্দে গোটা দুর্গাপূজা মাতোয়ারা হয়ে ওঠে, উৎসবের দিনগুলোতে আনন্দের জোয়ার ভাসায়, সেই সুর-শব্দের পেছনে লুকিয়ে থাকে শত শত ঢাকির […] The post আজ ঢাকে শেষ চাট্টি, কাল থেকেই সংগ্রাম শুরু first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.

আজ ঢাকে শেষ চাট্টি, কাল থেকেই সংগ্রাম শুরু
২১ অক্টোবর, ২০২৬ ১৬:০০  

ঢাকা: দেবী দুর্গা ফিরে যাচ্ছেন কৈলাসে। চারদিকে বিষাদের সুর, মণ্ডপে মণ্ডপে বিদায় আয়োজন। দশমীর শেষ মুহূর্তেও মণ্ডপে তুমুল বেজে চলেছে ঢাক। এই মিষ্টি ও গম্ভীর বাদ্যধ্বনি ছাড়া দুর্গাপূজার আবহ কল্পনাই করা যায় না। যে সুর আর ছন্দে গোটা দুর্গাপূজা মাতোয়ারা হয়ে ওঠে, উৎসবের দিনগুলোতে আনন্দের জোয়ার ভাসায়, সেই সুর-শব্দের পেছনে লুকিয়ে থাকে শত শত ঢাকির জীবন সংগ্রামের টানাপোড়েন গল্প। একবছরের দীর্ঘ অপেক্ষা শেষ হতে না হতেই শুরু হয় তাদের নিয়মিত সংগ্রামের গল্প।

পাবনার ছোট্ট এক গ্রাম থেকে পূজার আগেই ঢাকায় এসেছিলেন ৫৪ বছর বয়সী গোপাল দাস । বয়স বাড়লেও হাতের আঙুলে জং ধরেনি সামান্যও। তার সঙ্গে এসেছেন গোপাল নিখিল দাস ও তরুণ ঢাকী হৃদয় ঋষি। পাঁচ দিনের পূজায় তাদের একটাই লক্ষ্য থাকে- ভক্তির সুর-শব্দে শারদীয় উৎসবকে মাতিয়ে তোলা।

সারাবাংলার এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হচ্ছিল ঢাকী গোপাল দাসের । বুকচাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে তিনি বললেন, ‘পূজার দিনগুলা আমাগো কাছে স্বপ্নের মতো। মা দুগ্গাকে বরণ করি ভক্তিভরে। ঢাকের ছন্দে মানুষ হাসে, নাচে, আনন্দ করে। আমরাও ভুলে যাই কষ্ট। কিন্তু, ঢাকে শেষ চাট্টি পড়তেই মনে পড়ে যায়, কাল থেইক্যা আবার সেই অভাবের দিন শুরু।’

পূজার এই চার-পাঁচ দিনে তাদের আয় হয় প্রায় ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকার মতো (গ্রুপ বা মণ্ডপ ভেদে ভাগাভাগি হয়ে)। সার বছরের বড় একটা অর্থনৈতিক প্রত্যাশা এই সময়টাতেই এসে জমা হয়। উৎসবের জন্য তারা পুরো এক বছর পথ চেয়ে থাকেন।

দুর্গাপূজার আলোর রোশনাই নিভে গেলে ঢাকীদের জীবন আবার ফিরে যায় ধূসর বাস্তবতায়। শুধু ঢাক বাজিয়ে তো আর বছর জুড়ে সংসার চালানো সম্ভব নয়। তাই উৎসবের রেশ কাটতে না কাটতেই গোপাল-নিখিলদের হাতে ঢাকের বদলে ওঠে কাজের ভিন্ন হাতিয়ার।

গোপাল দাস বলেন, ‘পাবনা ও বিক্রমপুরের গ্রামগুলোতে ফিরে গিয়ে কৃষিকাজে নেমে পড়ি। অন্যের জমিতে দিনমজুর হিসেবে কাজ করি। মাঝে মাঝে নিজ ঘরে একাই ঢাক বাজাই।’

নিখিল দাস সারাবাংলাকে বলেন, ‘বছরের অন্য সময়ে বিয়ে, সুন্নতে খাতনা, কীর্তন কিংবা বৈশাখী মেলায় ঢোল বা কাঁসর বাজানোর বায়না ধরতে যাই। তবে সেসব বায়না নিয়মিত মেলে না।’

হৃদয় ঋষি আক্ষেপ করে এই প্রতিবেদকে বলেন, ‘এহন তো গান-বাজনার দিন বদলাইয়া গেছে। ডিজি সাউন্ড বক্সের যুগে মানুষ আর আগের মতো ঢাক-ঢোল খোঁজে না। পূজা আর দুয়েকটা অনুষ্ঠান ছাড়া আমগো ডাক পড়ে না বললেই চলে।’

ঢাকীদের এই নিঃশব্দ ত্যাগ ও ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা রক্ষা নিয়ে কথা বলেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদের জ্যেষ্ঠ নেতা কাজল দেবনাথ। ঢাকীদের জীবন-জীবিকা এবং সনাতন ঐতিহ্যে তাদের ভূমিকা তুলে ধরে কাজল সারাবাংলাকে বলেন, ‘ঢাক ছাড়া আমাদের শারদীয় উৎসব অসম্পূর্ণ। ঢাকের এই সুর কোনো সাধারণ বাদ্য নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতির প্রাণ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, যারা পুরো মণ্ডপকে আনন্দ আর ভক্তিতে ভরিয়ে তোলেন, উৎসব শেষে তারাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত থাকেন।’

তিনি আরও বলেন, ‘বছরের অন্য সময়গুলোতে ঢাকীদের জীবন অত্যন্ত কষ্টের মধ্য দিয়ে যায়। প্রযুক্তির ভিড়ে আমাদের এই লোকশিল্পীরা যেন হারিয়ে না যান, সেদিকে সবার নজর দেওয়া প্রয়োজন। পূজা পরিষদসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষের উচিত এদের পাশে দাঁড়ানো এবং এই প্রাচীন শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা।’

বিজয়া দশমীর সিঁদুর খেলা শেষ, প্রতিমা বিসর্জনে শেষ হচ্ছে পূজা। ‘বুড়িগঙ্গার তীরে বিসর্জনের শেষ ঢাকে বাড়ি দিয়ে গ্রামে ফিরে যাব’- এভাবে বলতে বলতে ঘাম মুছছিলেন ঢাকী নিখিল দাস। চোখ দুটো তার সামান্য জলে ভেজা। আনন্দের বিদায়, নাকি আগামী দিনগুলোর অনিশ্চয়তা!- কোন বিষাদে এই চোখ ভেজা, তা বোঝা দায়।

উৎসবের আলো নিভে যাবে আজ রাতে। গোপাল, নিখিল ও হৃদয় ঋষিরা ঢাক কাপড়ে পেঁচিয়ে আবার পা বাড়াবেন নিজ নিজ গন্তব্যে। বেঁচে থাকার নতুন লড়াই শুরু হবে কাল থেকেই।

The post আজ ঢাকে শেষ চাট্টি, কাল থেকেই সংগ্রাম শুরু first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.