বাংলায় যেভাবে এলো দুর্গাপূজা

দুর্গাপূজার ইতিহাস বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন, বিত্তশালী জমিদার পরিবারের উত্থান, সর্বজনীনভাবে পূজা আয়োজনের প্রসার এবং দেবী দুর্গাকে ঘিরে বাঙালির স্বতন্ত্র ভাবনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। বাঙালির কল্পনায় দুর্গা শুধু অশুভ শক্তির বিনাশকারী মহাশক্তি নন, তিনি সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়িতে ফিরে আসা এক আদুরে কন্যাও। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দেবী দুর্গার পূজা হয়। তবে বাংলায় শারদীয় দুর্গাপূজা […] The post বাংলায় যেভাবে এলো দুর্গাপূজা first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.

বাংলায় যেভাবে এলো দুর্গাপূজা
২১ অক্টোবর, ২০২৬ ১৬:০০  

দুর্গাপূজার ইতিহাস বাংলার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বিবর্তন, বিত্তশালী জমিদার পরিবারের উত্থান, সর্বজনীনভাবে পূজা আয়োজনের প্রসার এবং দেবী দুর্গাকে ঘিরে বাঙালির স্বতন্ত্র ভাবনার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত। বাঙালির কল্পনায় দুর্গা শুধু অশুভ শক্তির বিনাশকারী মহাশক্তি নন, তিনি সন্তানদের নিয়ে বাপের বাড়িতে ফিরে আসা এক আদুরে কন্যাও।

ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দেবী দুর্গার পূজা হয়। তবে বাংলায় শারদীয় দুর্গাপূজা নামে পরিচিত তার পূজা একটি অনন্য ঐতিহ্য গড়ে তুলেছে। হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, মহিষাসুর নামের মহিষরূপী অসুরকে পরাজিত ও বধ করেন দেবী দুর্গা। এর মধ্য দিয়ে অশুভ শক্তির ওপর দৈবশক্তির বিজয় হয়। বাংলায় এই পৌরাণিক কাহিনি বিশেষভাবে পারিবারিক ও আবেগঘন অর্থ লাভ করেছে।

দেবী দুর্গা বাঙালির কাছে উমা নামেও পরিচিত। তিনি হিমালয় ও মেনকার আদরের কন্যা, যিনি প্রতিবছর কয়েক দিনের জন্য বাপের বাড়িতে বেড়াতে আসেন। বাঙালির পরিচিত প্রতিমায় তাঁর সঙ্গে থাকেন সন্তান লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ। পৌরাণিক কাহিনি, মাতৃত্ব, পারিবারিক পুনর্মিলন ও ঘরে ফেরার এই সমন্বয় দুর্গাপূজাকে কেবল ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখে না; বরং তারঁ সঙ্গে বাঙালির গভীর আবেগ ও আত্মিক সম্পর্ক যুক্ত করে।

ষোড়শ শতাব্দীর শেষভাগ ও সপ্তদশ শতাব্দীতে বাংলার বিত্তশালী জমিদার ও রাজপরিবারগুলো জাঁকজমকপূর্ণ শরৎকালীন দুর্গাপূজা আয়োজনের ঐতিহ্য প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

দুর্গাপূজার ইতিহাস

পলাশীর যুদ্ধ শেষ। হেরে গেলেন সিরাজ। জিতল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। বাংলার ধনসম্পদ নিজেদের মধ‍্যে ভাগ করে নিল লুটেরারা। এদের অন‍্যতম নবকৃষ্ণ দেব।

‘The Corporation That Changed the World: How the East India Company Shaped the Modern Multinational’ শীর্ষক বইয়ে লেখক নিক রবিনস লিখেছেন সিরাজের রাজত্বের পতনের পর বাংলার তোষাখানা লুট করতে ব্রিটিশদের সাহায্য করেন নবকৃষ্ণ। রাতারাতি ‘৮০০ কোটি টাকা মূল্যের সোনা, রুপা, এবং গয়নাগাঁটি’ ভাগ করে নেন তারা নিজেদের মধ‍্যে।

ইংরেজদের পক্ষ নেওয়ার জন্য নবকৃষ্ণ পেলেন ‘রাজা বাহাদুর’ খেতাব। অতঃপর ১৭৬৬ সালে ‘মহারাজা বাহাদুর’। সব থেকে বড় কথা, গোটা সুতানুটি অঞ্চলের তালুকদার হয়ে গেলেন তিনি। সামান্য মুনশি থেকে বিশাল সাম্রাজ্য ও ধন-দৌলতের মালিক- এমনই চমকপ্রদ উত্থান রাজা নবকৃষ্ণ দেবের।

১৯৯৭ সালের ৫ অক্টোবর কলকাতার আনন্দবাজার’ পত্রিকার রবিবাসরীয়তে ‘ক্লাইভের দুর্গোৎসব’ প্রবন্ধে প্রাবন্ধিক নির্মল কর উল্লেখ করেছেন, ‘নবকৃষ্ণ দেব ছিল ইংরেজদের চাকর। কোনো সময় ছিল ওয়ারেন হেস্টিংসের প্রাইভেট টিউটর। উন্নতি করে হয়েছিল তালুকদার, চার হাজারি মনসবদার। পলাশীতে সিরাজের পতনে যারা সবচেয়ে বেশি উল্লসিত হয়েছিল তাদের মধ্যে ছিল নদীয়ার কৃষ্ণচন্দ্র আর কলকাতার নবকৃষ্ণ দেব।’

অঢেল টাকা এসেছে, এবার চাই খানিকটা সম্মানও। ক্লাইভ নবকৃষ্ণকে বোঝালেন কলকাতায় একটি বিজয় উৎসব করার জন্য। ‘হিন্দু ভাবাবেগ’ রক্ষা পেয়েছে বলে কথা! নবকৃষ্ণ তখনই বাংলার বাসন্তীপূজোকে এগিয়ে এনে লাগিয়ে দিলেন ‘দুর্গাপূজা’। এর আগে শরৎকালে নবপত্রিকার পূজো প্রচলিত ছিল।

দেখতে দেখতে গড়ে উঠল একচালা প্রতিমা। প্রতিমার গা ভর্তি সোনার গয়না ঝলমল করে উঠল। দুর্গার কেশদামে গুঁজে দেওয়া হলো ২৬টি স্বর্ণনির্মিত স্বর্ণচাঁপা। নাকে ৩০টি নথ। মাথায় সোনার মুকুট। তারপর তোপধ্বনির পর সন্ধিপূজোর শুরু। দৈনিক নৈবেদ্য দেওয়া হলো ২৩ মণ চালের। সাহেব-মেমরা তো বটেই, স্বয়ং ওয়ারেন হেস্টিংস পর্যন্ত হাতিতে চড়ে এসেছিলেন সেই পূজায়। ক্লাইভ দক্ষিণা দিয়েছিলেন ১০১ টাকা। সাহেব-সুবোরা মৌজ করে দেখলেন বাঈজি নাচ। এ ছাড়াও, পানভোজন ও মনোরঞ্জনের নানা উপচার তো ছিলই।

এসব অভিজাত পরিবারের পূজা ছিল ধর্মীয় আয়োজনের পাশাপাশি বিত্ত, মর্যাদা ও সামাজিক প্রভাব প্রদর্শনের উপলক্ষ। সংগীত, ভোজ, নাট্য পরিবেশনা এবং বর্ণাঢ্য সাজসজ্জা পূজাকে বড় ধরনের সামাজিক উৎসবে রূপ দেয়। ফলে দুর্গাপূজা কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান না থেকে বাঙালির বৃহত্তর সামাজিক জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়োজনে পরিণত হয়।

জমিদারবাড়ির আঙিনা থেকে গণমানুষের উৎসব

দীর্ঘদিন ধরে সবচেয়ে জাঁকজমকপূর্ণ দুর্গাপূজার আয়োজন করত বিত্তশালী জমিদার পরিবারগুলো। সাধারণ মানুষ ধর্মীয় কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারলেও অভিজাতদের ব্যক্তিগত আয়োজনে সাধারণ মানুষের তেমন প্রবেশাধিকার ছিল না। সময়ের সঙ্গে এই পরিস্থিতির পরিবর্তন শুরু হয় বারোয়ারি পূজার প্রসারের মধ্য দিয়ে। এ ধরনের পূজায় একাধিক ব্যক্তি বা পরিবার চাঁদা ও সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে পূজার আয়োজন করতেন।

প্রচলিত একটি বিবরণ অনুযায়ী, হুগলির গুপ্তিপাড়ায় কয়েকজন বন্ধু একত্রে পূজার আয়োজন করে এই ধারার সূচনা করেন। তবে ঐতিহাসিক বিবরণে এ আয়োজনের সময় নিয়ে মতভেদ রয়েছে। কারও মতে, এটি ১৭৬০-এর দশকে, আবার কারও মতে, ১৭৯০ সালের দিকে অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কলকাতায় সর্বসাধারণের অংশগ্রহণে আয়োজিত পূজা ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

বাঙালির পরিচয়ের প্রতীক দুর্গাপূজা

ভাষা, সাহিত্য, খাবার, সংগীত, পারিবারিক সম্পর্ক ও অভিন্ন সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মধ্য দিয়ে বাঙালি পরিচয় প্রকাশ পায়। দুর্গাপূজা ধীরে ধীরে এসব উপাদানকে এক বার্ষিক উৎসবে একত্র করেছে। এই উৎসবের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে রয়েছে মহালয়া, ঢাক, পূজামণ্ডপ ও প্রতিমা, আড্ডা, খাবার, নতুন পোশাক এবং বিজয়া দশমী।

অনেক বাঙালির কাছে মহিষাসুরমর্দিনী পাঠের মধ্য দিয়ে মহালয়া উৎসবের আবেগঘন সূচনা ঘটায়। ঢাকের স্বতন্ত্র বাদ্যধ্বনি তৈরি করে উৎসবের অনন্য আবহ। মৃৎশিল্পী ও কারুশিল্পীরা মাটিকে রূপ দেন দেবী প্রতিমায়, আর নকশাবিদেরা পূজা ও উৎসবের জন্য নির্মাণ করেন নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর অস্থায়ী মণ্ডপ।

বিজয়া দশমীতে দেবীর বিদায় আবার মিলন ও বিচ্ছেদের আবেগ জাগায়। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে দেবী দুর্গার পূজা হলেও এসব ঐতিহ্য দুর্গাপূজাকে স্বতন্ত্র বাঙালি বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। ঔপনিবেশিক আমলে বাঙালির জনজীবন, সাহিত্য, শিল্পকলা ও সামষ্টিক পরিচয়বোধে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটছিল। সে সময় দুর্গাপূজা আরও বিস্তৃত সাংস্কৃতিক তাৎপর্য লাভ করে। ধর্মীয় সমাবেশ মানুষের মধ্যে অভিন্ন পরিচয় ও আত্মীয়তার অনুভূতি প্রকাশের ক্ষেত্র তৈরি করে।

The post বাংলায় যেভাবে এলো দুর্গাপূজা first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.