দ্বিতীয় পর্বে সিলিকান রিভারের বেয়ার সামিটে যা থাকছে, যারা থাকছেন

‘বৈশ্বিক অংশীদারত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর ভবিষ্যৎ নির্মাণ’ প্রতিপাদ্যে অনুষ্ঠিত হচ্ছে জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম বেয়ার সামিট ২০২৬।

দ্বিতীয় পর্বে সিলিকান রিভারের বেয়ার সামিটে যা থাকছে, যারা থাকছেন
২৩ জুলাই, ২০২৬ ১৮:৩০  

একটি ছোট্ট সিলিকন চিপ, যা আজকের উন্নত বিশ্বের হৃৎস্পন্দন নিয়ন্ত্রণ করে। সেই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশ এখন আর দর্শক নয়। শুরু করেছে উদ্ভাবকের ভূমিকায় জায়গা করে নেওয়ার মিশিন। "নিউ ডন, নিউ পসিবিলিটিস, লিমিটলেস ফিউচার" বা "নতুন ভোর, নতুন সম্ভাবনা ও সীমাহীন ভবিষ্যৎ"- এমন দৃপ্ত শপথ বুকে ধারণ করে তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে গড়ে উঠছে বাংলাদেশের সেমিকন্ডাক্টর শিল্পের বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশন (বিএসআইএ) এবং সিলিকন রিভারের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতীয় সেমিকন্ডাক্টর সিম্পোজিয়াম বিইএআর (BEAR) সামিট ২০২৬। 'বায়োটেক, ইলেকট্রনিক্স, এআই এবং রোবোটিক্স'- প্রযুক্তির এই চার প্রধান ক্ষেত্রকে এক সুতোয় বেঁধে বাংলাদেশকে বিশ্ব মানচিত্রে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়াই এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য।

বেয়ার সামিটের এই মহামিলনের চূড়ান্ত প্রস্তুতি শেষ হবে ২৪ জুলাই শুক্রবার বিকেলে ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (ইউআইইউ) আয়োজিত 'বর্ধিত প্রাক-সম্মেলন প্রোগ্রাম'-এর মাধ্যমে। বিকেল ৩টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ইউআইইউ ক্যাম্পাসে বসবে দেশি-বিদেশি গবেষক ও প্রযুক্তিবিদদের মিলনমেলা। পার্ড্যু বিশ্ববিদালয়ের অধ্যাপক ও সিলিকন রিভারের চিফ আর্কিটেক্ট অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুস্তাফা হুসেইনের উদ্বোধনী বক্তব্যের পর অনুষ্ঠিত হবে দুটি মর্যাদাপূর্ণ প্ল্যানারি সেশন। টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টসের চিফ টেকনোলজি অফিসার ড. আহমেদ বাহাই এবং পার্ড্যু বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. দিমিত্রিওস পেরুলিস তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা তুলে ধরবেন।

এরপর প্রযুক্তি দুনিয়ার দুই দিকপাল—ভিএসপিএ চেয়ারম্যান বিচ-ইয়েন থি ট্র্যান এবং স্যানডিস্কের টেকনোলজি ডেভেলপমেন্টের ডিস্টিংগুইশড ইঞ্জিনিয়ার জায়াভেল পাচামুঠু উপস্থাপন করবেন তাদের গবেষণাধর্মী কি-নোট। বিকেল ৪টা ৫ মিনিটে ৫ মিনিটের সানশাইন লাইটনিং টক সেশনে প্রযুক্তির সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে দ্রুতগতির বক্তব্য রাখবেন অ্যাপ্লাইড মেটেরিয়ালসের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আনিসুল খান, ক্রিডোর সহযোগী ভাইস প্রেসিডেন্ট শতিল হক, অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক টেরি লিন আলফোর্ড, এনএক্সপি সেমিকন্ডাক্টরসের আরঅ্যান্ডডি ডিরেক্টর সৈয়দ বদরুদ্দোজা এবং ওয়াইইএস-এর চিফ টেকনোলজি অফিসার এম জিয়াউল করিম। পরবর্তীতে শিক্ষার্থী ও গবেষকদের উপস্থিতিতে আধা ঘণ্টার প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তরুণদের সরাসরি শিল্প বিশেষজ্ঞদের সাথে যুক্ত করা হবে, যা শেষ হবে নেটওয়ার্কিং ও সান্ধ্যকালীন যুথবদ্ধতার মাধ্যমে।

মূল সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে ২৫ জুলাই, শনিবার সকালে রাজধানীর বিজয় সরণির নভোথিয়েটারে। উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি থাকবেন ডাক, টেলিযোগাযোগ, আইসিটি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব এনাম ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। স্বাগত বক্তব্য দেবেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মোঃ আনোয়ার হোসেন। কি-নোট স্পিকার হিসেবে থাকবেন অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুস্তাফা হুসেইন এবং বেয়ার সভাপতি এম. এ. জাব্বার।

আয়োজনের দর্শন ব্যাখ্যা করে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মোঃ আনোয়ার হোসেন সরকারের নতুন রূপরেখা- "Science to Economy: Building a Market-Linked, Innovation-Driven Bangladesh"। তিনি জানান, চারটি মূল স্তম্ভের ওপর ভর করে এগোচ্ছে সরকার। এই চারটি হলো- প্রাথমিক স্তর থেকে অলিম্পিয়াডের মাধ্যমে মানবসম্পদ তৈরি, কেবল গবেষণায় সীমাবদ্ধ না থেকে সেটিকে বাজারে কার্যকর পণ্যে রূপান্তর (R2M), আগামী সেপ্টেম্বরে ‘বাংলাদেশ জাতীয় উদ্ভাবন মেলা ২০২৬’ ও ভার্চুয়াল হাই-টেক সাইন্স সিটি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ (I2M) এবং এআই, স্পেস ও সেমিকন্ডাক্টর নকশার মতো ফ্রন্টিয়ার প্রযুক্তির আধুনিকায়ন। একই সাথে একাডেমিয়া ও শিল্পের সমন্বয়ে একটি জাতীয় এআই ইনস্টিটিউট গড়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।

অন্যদিকে অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুস্তাফা হুসেইন তাগিদ দেন বিগত বছরে ঘোষিত সেমিকন্ডাক্টর নীতিমালার দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর। তিনি দৃঢ়ভাবে ব্যক্ত করেন, সিলিকন রিভার কেবল কোনো ব্যক্তি বিশেষের ধারণা নয়, এটি বাংলাদেশের নিজস্ব পরিচয় তৈরির এক টেকসই দর্শন। দুই ভাগে বিভক্ত বৈশ্বিক সেমিকন্ডাক্টর বাজারে বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট ব্লকের অনুসারী না হয়ে প্রযুক্তি-নিরপেক্ষ এক স্বতন্ত্র শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

২৫ ও ২৬ জুলাই নভোথিয়েটারে অনুষ্ঠিতব্য ২ দিনের মূল সম্মেলনে ১১টি প্ল্যানারি ও ৭টি স্ট্র্যাটেজিক প্যানেল সেশনের আয়োজন করা হয়েছে, যা সেমিকন্ডাক্টরের প্রতিটি কৌশলগত দিক স্পর্শ করবে:

সেশন ১ (২৫ জুলাই, ৩:৩০ PM): ‘বাংলাদেশ সেমিকন্ডাক্টর অ্যান্ড স্টেম ট্যালেন্ট ফোর্স ডেভেলপমেন্ট স্ট্র্যাটেজি’ সেশনে মডারেটর থাকবেন সাসকাচেওয়ান বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক খান আরিফ ওয়াহিদ। প্যানেলিস্ট হিসেবে থাকবেন শিক্ষা বিষয়ক প্রধানমন্ত্রীর মাননীয় উপদেষ্টা ড.. মো. মাহাদী আমিন, নিউরাল সেমিকন্ডাক্টরের সিইও মো. সাখাওয়াত হোসেন, প্রাইম সিলিকনের সিইও ইস্তাক আহমেদ, আইইউটির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. মামুন বিন রিয়াজ, অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ মুস্তাফা হুসেইন এবং অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক টেরি লিন আলফোর্ড।

সেশন ২ (২৫ জুলাই, ৪:৩০ PM): ‘বিল্ডিং বাংলাদেশ'স সেমিকন্ডাক্টর ইকোসিস্টেম’ আলোচনা পরিচালনা করবেন গ্লোবালফাউন্ড্রিজের ভাইস প্রেসিডেন্ট ড. মাহবুব রশিদ। এতে অংশ নেবেন এসআইসিপি-র অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ ওয়ালিদ হোসেন, উল্কাসেমির সিইও এনায়াতুর রহমান, ইউআইইউ-এর সাবেক উপাচার্য ড. এম. রেজওয়ান খান, এনএক্সপি-র সৈয়দ বদরুদ্দোজা এবং ভিয়েতনাম সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান বিচ-ইয়েন থি ট্র্যান।

সেশন ৩ (২৫ জুলাই, ৫:৩০ PM): ‘গ্লোবাল সেমিকন্ডাক্টর ইন্ডাস্ট্রি লিডারশিপ ডায়ালগ’ মডারেট করবেন ড. মুস্তাফা হুসেইন। প্যানেলিস্ট থাকবেন নিউরাল সেমিকন্ডাক্টরের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম এ জাব্বার, আইটেস্ট বাংলাদেশের পরিচালক মুনীর আহমেদ, উল্কাসেমির এনায়াতুর রহমান এবং টেক্সাস ইনস্ট্রুমেন্টসের ড. আহমেদ বাহাই।

সেশন ৪ (২৬ জুলাই, ১০:০০ AM): ‘ইন্টারন্যাশনাল পার্টনারশিপ ফোরাম’ সঞ্চালনা করবেন ক্রিডোর শতিল হক। বক্তব্য দেবেন এলঅ্যান্ডটি সেমিকন্ডাক্টরের আহসান চৌধুরী, ক্যাকটাস মেটেরিয়ালসের ক্রিস্তোফার গ্রুনম, সিলিকোনোভার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এম ই চৌধুরী শামিম, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হাসান উজ জামান, ড. আনিসুল খান এবং অধ্যাপক দিমিত্রিওস পেরুলিস।

সেশন ৫ (২৬ জুলাই, ১১:০০ AM): ‘রিসার্চ টু মার্কেট: প্রিপেয়ারিং বাংলাদেশ ফর ফিউচার ইন্ডাস্ট্রিজ’ সঞ্চালনা করবেন সৈয়দ বদরুদ্দোজা। আলোচনায় থাকবেন এনবিআরের ফার্স্ট সেক্রেটারি মো. তারিক হাসান, আইটেস্টের মুনীর আহমেদ, থিঙ্ক ল্যাবের সিইও আশিকুর তানিম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মো. শফিউল আলম, গ্লোবালফাউন্ড্রিজের ড. মাহবুব রশিদ এবং ভিয়েতনাম সেমিকন্ডাক্টর অ্যাসোসিয়েশনের লে হোয়াং ফুক।

সেশন ৬ (২৬ জুলাই, ১:০০ PM): ‘গ্লোবাল লিডারশিপ অ্যান্ড ডায়াসপোরা ফোরাম: নলেজ ট্রান্সফার অ্যান্ড শেয়ারিং’ সেশনে কি-নোট দেবেন ওয়াইইএস-এর ডায়াসপোরা ব্যক্তিত্ব এম জিয়াউল করিম। মডারেট করবেন ড. আনিসুল খান। প্যানেলে থাকবেন বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সাডমান রহমান, ব্রেইঙ্গেইনের সিইও কামরুল আহসান দেওয়ানজী, ওয়াইইএস-এর ড. এম জিয়াউল করিম এবং নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক অব্দুল হান্নান চৌধুরী।

সেশন ৭ (২৬ জুলাই, ২:১৫ PM): ‘এন্ট্রাপ্রেনিওরশিপ অ্যান্ড ডিপ-টেক স্টার্টআপস’ সেশন সঞ্চালনা করবেন প্রাইম সিলিকনের সিওও মো. তারেক খান ও আইটেস্টের সৈয়দ মুনীর। প্যানেলিস্ট থাকবেন স্টার্টআপ বাংলাদেশ লি.-এর তানভীর আলী, টেস্ট বাংলাদেশের সিরাজুল ইসলাম খান, বুয়েটের অধ্যাপক মো. নাদিম চৌধুরী, শতিল হক এবং স্যানডিস্কের জায়াভেল পাচামুঠু।

প্যানেল আলোচনার পাশাপাশি সম্মেলনে বিশেষ আর্কষণ হিসেবে থাকছে 'ক্রেস্ট ফেলোস রিসার্চ সিম্পোজিয়াম'। বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪০টির বেশি ক্যাম্পাস থেকে বাছাই করা ৯৩ জন ক্যাম্পাস অ্যাম্বাসেডর, নিবন্ধিত হাজারো শিক্ষার্থী এবং এআই অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপমেন্ট প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া ১০০ তরুণদের মধ্য থেকে নির্বাচিত শীর্ষ ১০ জন 'ক্রস্ট ফেলো' তাদের গবেষণা মেধা প্রদর্শন করবেন। অ্যাডভান্সড চিপস, এআই হার্ডওয়্যার, ৩ডি ইন্টিগ্রেশন, ফটোনিক্স, বায়োইলেকট্রনিক্স, পাওয়ার ইলেকট্রনিক্স, রোবোটিক্স, ডেটা সাইন্স ও মেটেরিয়ালস অ্যাডভান্সমেন্টের মতো ১০টি যুগান্তকারী খাতে তরুণদের এই গবেষণা সরাসরি প্রদর্শিত হবে।

এবারের সম্মেলনে মেলা প্রাঙ্গণে বায়োটেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোবোটিক্সের বাংলাদেশের ১৯টি বিশ্বমানের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৩টি তাদের উদ্ভাবন নিয়ে হাজির হচ্ছে। দর্শনার্থীদের নজর কাড়বে এসিআই সেমিকন্ডাক্টর, বালু টেকনোলজিস, ডায়নামিক সল্যুশন ইনোভেটরস, আইটেস্ট বাংলাদেশ, মার্স সল্যুশন, মেট্রো সাইয়েন্টিফিক, নিউরাল সেমিকন্ডাক্টর, প্রাইম সিলিকন, সিলিকোনোভা, টাফুরি টেকনোলজিস, তাহো প্রাইভেট লিমিটেড, থিংক গ্লোবাল এবং উল্কাসেমাই প্রাইভেট লিমিটেডের তৈরি নিত্যনতুন প্রযুক্তি ও চিপ ডিজাইন।

দিনশেষে তরুণদের উদ্যম আর বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা প্রবাসী গবেষকদের যৌথ উদ্যোগে বাংলাদেশ এখন বিশ্ব সেমিকন্ডাক্টর মানচিত্রে নিজের আসন স্থায়ী করার দ্বারপ্রান্তে। ২৬ জুলাই বিকেলে 'সম্মেলন ঘোষণা' এবং দ্বিতীয় বেয়ার সামিটের নীতি সুপারিশমালা প্রকাশের মধ্য দিয়ে সমাপনী পর্বে নতুন এক প্রযুক্তিনির্ভর বাংলাদেশের দিগন্ত উন্মোচিত হতে যাচ্ছে।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এসএমই//