একনেকে ১৪,০৪১ কোটি টাকার ৮ প্রকল্প অনুমোদন 

৪৭ কোটি টাকায় শাহজালাল বিমানবন্দরে আধুনিক নেটওয়ার্ক স্থাপন করবে টেলিটক

  • শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে টেলিটকের ৪জি-৫জি নেটওয়ার্ক স্থাপনে ৪৭.৬৩ কোটি টাকার প্রকল্প
  • একনেকে ১৪,০৪১.২১ কোটি টাকা ব্যয়ের ৮টি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদন।
  • বিমানবন্দরে ইনডোর নেটওয়ার্ক উন্নত করতে অ্যাকটিভ ডিএএস প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে।

৪৭ কোটি টাকায় শাহজালাল বিমানবন্দরে আধুনিক নেটওয়ার্ক স্থাপন করবে টেলিটক
২২ জুলাই, ২০২৬ ১৪:১৯  

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নবনির্মিত ৩য় টার্মিনালে দেশি-বিদেশি যাত্রী ও সংশ্লিষ্ট সেবা প্রদানকারী সংস্থাগুলোর জন্য দ্রুতগতির ও নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক সেবা নিশ্চিত করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ৪৭ কোটি ৬৩ লাখ টাকা ব্যয়ের এই টেলিকম অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ চলতি বছর থেকে শুরু হয়ে ২০২৭ সালের জুনে শেষ হবে, যা বাস্তবায়ন করবে রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড।

২২ জুলাই, বুধবার, বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় এই অবহিতকরণসহ মোট ১৪ হাজার ৪১ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয় সম্বলিত ৮টি প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়। এটি ছিল ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম এবং বর্তমান সরকারের ষষ্ঠ একনেক সভা। এছাড়াও ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয় হওয়ায় পরিকল্পনা মন্ত্রীর একক এখতিয়ারে অনুমোদিত ১১টি প্রকল্প সম্পর্কে সভাটি অবহিত করা হয়, যার অন্যতম শাহজালাল বিমানবন্দরের নেটওয়ার্ক স্থাপন প্রকল্প।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, দেশের প্রধান আন্তর্জাতিক প্রবেশদ্বার শাহজালাল বিমানবন্দরে বার্ষিক যাত্রী পরিবহন সক্ষমতা প্রায় ১ কোটি ৮৫ লাখ (১৮.৫ মিলিয়ন)। তবে টার্মিনাল-৩ এবং কার্গো টার্মিনাল ভবনের ঘন কংক্রিট, মেটালিক স্ট্রাকচার ও সিকিউরিটি বিধিনিষেধের কারণে বাইরের টাওয়ার থেকে আসা সিগন্যাল বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে ব্যাগেজ হল, ইমিগ্রেশন, চেক-ইন কাউন্টার, ভিআইপি লাউঞ্জ ও এপ্রন এলাকায় কল ড্রপ, দুর্বল সিগন্যাল ও ধীরগতির ইন্টারনেটের মতো সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছিল।

নিরাপত্তাজনিত কারণে নতুন কোনো টাওয়ার বা উন্মুক্ত বিটিএস (BTS) স্থাপনের সুযোগ না থাকায়, ইনডোর কভারেজের উপযোগী 'অ্যাকটিভ ডিস্ট্রিবিউটেড অ্যান্টেনা সিস্টেম' (Active DAS) প্রযুক্তির সাহায্যে বিশেষ নেটওয়ার্ক অবকাঠামো তৈরি করা হবে। এর ফলে টার্মিনালজুড়ে অত্যাধুনিক ৪জি ও ৫জি সেবা নিশ্চিতের পাশাপাশি নির্বিঘ্ন রোমিং সুবিধা দেওয়া সম্ভব হবে। তবে প্রকল্পটি টেলিটক একাই করতে সক্ষম হবে কি না সেই প্রশ্ন ওঠায় বাস্তবায়নে অংশীদার নেয়ার পরিকল্পনা চলছে বলে জানিয়েছে একটি সূত্র।

একনেক সভায় অনুমোদিত ৮টি প্রকল্প: ব্যয় ও সংশোধনীর বিস্তারিত হিসাব

একনেক সভাপতির উপস্থিতিতে অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ কমিটির শীর্ষ মন্ত্রীবর্গ ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন এই সভায়। মোট ৮টি প্রকল্পের জন্য অনুমোদিত ১৪,০৪১.২১ কোটি টাকার মধ্যে সরকারি অর্থায়ন (জিওবি) ১০,৪৯৪.৩১ কোটি টাকা এবং প্রকল্প ঋণ ৩,৫৫০.৪৪ কোটি টাকা। একনেক টেবিলের তথ্য অনুযায়ী প্রকল্পভিত্তিক ব্যয়বৃদ্ধি ও সংশোধনীর বিবরণ নিম্নরূপ:

নতুন প্রকল্প

  • বৃহত্তর দিনাজপুর (দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়) জেলা সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প — সম্পূর্ণ নতুন প্রকল্প হিসেবে ১,৪৯২.৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদিত হয়েছে, পুরোটাই সরকারি অর্থায়নে। মেয়াদকাল এপ্রিল ২০২৬ থেকে জুন ২০৩০ পর্যন্ত। বাস্তবায়নে থাকবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)।
  • পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থান প্রকল্প — নতুন প্রকল্প হিসেবে ২,০৮২.১২ কোটি টাকা সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে অনুমোদিত, মেয়াদ জুলাই ২০২৬ থেকে ডিসেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত। বাস্তবায়নকারী এলজিইডি।
  • বেগমগঞ্জ-৫ মূল্যায়ন কাম উন্নয়ন কূপ ও বেগমগঞ্জ-৬, সুনেত্র-২ অনুসন্ধান কূপ খনন প্রকল্প — নতুন প্রকল্প হিসেবে মোট ৭২৯.২২ কোটি টাকা অনুমোদিত হয়েছে, যার মধ্যে জিওবি ৫৮৩.৩৭ কোটি টাকা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থার (বাপেক্স ও পেট্রোবাংলা) নিজস্ব অর্থায়ন ১৪৫.৮৫ কোটি টাকা। মেয়াদকাল জানুয়ারি ২০২৬ থেকে জুন ২০২৮।

সংশোধিত প্রকল্প: ব্যয়বৃদ্ধির বিস্তারিত চিত্র

  • সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন-২ (১ম সংশোধন) — মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১,০৮২.০০ কোটি টাকা, যা ১ম সংশোধনীতে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১,৪৫০.০০ কোটি টাকায়, অর্থাৎ ৩৬৮ কোটি টাকা ব্যয়বৃদ্ধি ঘটেছে। পুরো অর্থায়ন সরকারি খাত থেকে। মূল মেয়াদ জুলাই ২০২২ থেকে জুন ২০২৭ পর্যন্ত। বাস্তবায়নকারী এলজিইডি।
  • দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্প (৩য় সংশোধন) — মূল ব্যয় ১,৯৫৭.৪৯ কোটি টাকা থেকে ধারাবাহিক সংশোধনীর মধ্য দিয়ে (১ম সংশোধনে ১,৯৯৭.৪৭ কোটি, ২য় সংশোধনে ১,৯০৩.৫৩ কোটি টাকা) সবশেষ ৩য় সংশোধনীতে সামগ্রিক ১,০২৩.৩১ কোটি টাকা ব্যয়বৃদ্ধি নথিভুক্ত হয়েছে। প্রকল্পের মূল মেয়াদ ছিল জুলাই ২০১৮-ডিসেম্বর ২০২১, যা সংশোধিত হয়ে জুলাই ২০১৮ থেকে ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়েছে। বাস্তবায়নকারী দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর।
  • ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্প (২য় সংশোধন) — তালিকার সবচেয়ে বড় ব্যয়বৃদ্ধির প্রকল্প। মূল অনুমোদিত ব্যয় ছিল ১৬,৯০১.৩২ কোটি টাকা, যা ১ম সংশোধনীতে বেড়ে ১৭,৫৫৩.০৪ কোটি এবং সবশেষ ২য় সংশোধনীতে দাঁড়িয়েছে ২৭,০৪৫.৬৮ কোটি টাকায় — অর্থাৎ সব মিলিয়ে ৯,৪৯২.৬৪ কোটি টাকা ব্যয়বৃদ্ধি। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন বেড়েছে ৫,৯৪২.১৯ কোটি টাকা এবং প্রকল্প ঋণ বেড়েছে ৩,৫৫০.৪৪ কোটি টাকা। প্রকল্পের মেয়াদ সেপ্টেম্বর ২০১৭-জুন ২০২২ থেকে সম্প্রসারিত হয়ে সেপ্টেম্বর ২০১৭-জুন ২০৩০ পর্যন্ত করা হয়েছে। বাস্তবায়নকারী বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে।
  • মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ডায়ালাইসিস সেন্টার ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ ও জেলা হাসপাতালে ১০ শয্যার ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন (২য় সংশোধন) — মূল ব্যয় ২৫৫.২২ কোটি টাকা থেকে ১ম সংশোধনীতে ২৯৪.১৬ কোটি এবং ২য় সংশোধনীতে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭৫.৪৭ কোটি টাকায়, অর্থাৎ ৮১.৩১ কোটি টাকা ব্যয়বৃদ্ধি। মূল মেয়াদ জানুয়ারি ২০২০-ডিসেম্বর ২০২২ থেকে সম্প্রসারিত হয়ে জানুয়ারি ২০২০-ডিসেম্বর ২০২৭ পর্যন্ত করা হয়েছে। বাস্তবায়নকারী স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।

ব্যতিক্রম: যে প্রকল্পে ব্যয় কমেছে

  • সিলেট বিভাগে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প (৩য় সংশোধন) — এটি তালিকার একমাত্র প্রকল্প যেখানে ব্যয় বৃদ্ধির বদলে ব্যয় হ্রাস পেয়েছে। মূল ব্যয় ছিল ১,৮৯০.৮৫ কোটি টাকা, যা ১ম সংশোধনীতে সাময়িক বেড়ে ২,০৫২.৯৫ কোটি টাকা হলেও পরবর্তী ২য় সংশোধনীতে কমে ১,৮৪০.৮৭ কোটি এবং সবশেষ ৩য় সংশোধনীতে আরও কমে দাঁড়িয়েছে ১,৭২৩.৪৬ কোটি টাকায় — মোট ১১৭.৪১ কোটি টাকা ব্যয় হ্রাস। মূল মেয়াদ এপ্রিল ২০১৬-মার্চ ২০১৯ থেকে সম্প্রসারিত হয়ে এপ্রিল ২০১৬-জুন ২০২৬ পর্যন্ত করা হয়েছে। বাস্তবায়নকারী বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)।

সামগ্রিক অর্থায়ন চিত্র

৮টি প্রকল্পের সম্মিলিত হিসাবে মোট অনুমোদিত ব্যয় ১৪,০৪১.২১ কোটি টাকার মধ্যে সরকারি অর্থায়ন (জিওবি) ১০,৪৯৪.৩১ কোটি টাকা এবং প্রকল্প ঋণ/অনুদান ৩,৫৫০.৪৪ কোটি টাকা, যেখানে সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে সামান্য হ্রাস (৩.৫৪ কোটি টাকা) লক্ষ করা গেছে। এই তথ্য প্রমাণ করে যে, বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলোর মধ্যে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে এবং দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র প্রকল্প ব্যয়বৃদ্ধির দিক থেকে শীর্ষে রয়েছে, যেখানে একমাত্র সিলেটের বিদ্যুৎ বিতরণ প্রকল্পে ব্যয় সাশ্রয় হয়েছে।

এছাড়াও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩টি আঞ্চলিক অফিস স্থাপন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ ইভাকুয়েশন সঞ্চালন লাইনসহ ৫০ কোটি টাকার নিচের মোট ১১টি অবহিতকরণ প্রকল্পের অগ্রগতি সভার সামনে তুলে ধরা হয়। 
//ডিবিটেক/এসএইচটি/এসএমই//