গ্রামীণফোন ও কর্পোরেট গভর্ন্যান্স: সংকট নিরসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা

গ্রামীণফোন ও কর্পোরেট গভর্ন্যান্স: সংকট নিরসনে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও নেতৃত্বের প্রকৃত পরীক্ষা
২০ জুলাই, ২০২৬ ০০:০০  
২০ জুলাই, ২০২৬ ১৫:৩৬  

কর্পোরেট ইতিহাসের অধিকাংশ বড় সংকট কোনো একক ভুল সিদ্ধান্তের ফল নয়। এগুলো সাধারণত দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা প্রাতিষ্ঠানিক জড়তার বহিঃপ্রকাশ, যেখানে জবাবদিহিতা দুর্বল হয়ে পড়ে, ভিন্নমত সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকে ক্রমশ হারিয়ে যায় এবং অমীমাংসিত বিরোধ প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়। তখন কর্পোরেট গভর্ন্যান্স আর কার্যকর তদারকির ব্যবস্থা থাকে না; বরং তা কেবল আনুষ্ঠানিক কর্তৃত্বের একটি কাঠামো হয়ে দাঁড়ায়। আধুনিক কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের মূল দর্শন এখানেই। একটি প্রতিষ্ঠানের সাফল্য কেবল আর্থিক ফলাফল, বাজার অংশীদারিত্ব বা প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না। সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হলো পরিচালনা পর্ষদের কার্যকর তদারকি, নেতৃত্বের জবাবদিহিতা, স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, নৈতিক ব্যবসায়িক সংস্কৃতি এবং স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি আস্থাভিত্তিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সক্ষমতা।

এই কারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের ধারণা উল্লেখযোগ্যভাবে বিস্তৃত হয়েছে। আজ বিনিয়োগকারী, নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক রেটিং এজেন্সিগুলো আর শুধু মুনাফার পরিমাণ দেখে কোনো প্রতিষ্ঠানের সাফল্য মূল্যায়ন করে না; বরং তারা মূল্যায়ন করে একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে তার কর্মী, গ্রাহক, শেয়ারহোল্ডার, ব্যবসায়িক অংশীদার এবং বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনা করছে। দীর্ঘস্থায়ী স্টেকহোল্ডার বিরোধ এখন কেবল একটি আইনি বিষয় নয়; এটি ক্রমেই একটি গভর্ন্যান্স ঝুঁকি (Governance Risk) হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে গ্রামীণফোনকে ঘিরে বহু বছর ধরে চলমান কর্মী-সংক্রান্ত বিরোধ কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের আলোকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে নিয়ে আসে। দীর্ঘমেয়াদি আইনি বিরোধ, সাবেক কর্মীদের অসন্তোষ, বিপুল সংখ্যক মামলা এবং বিষয়টি নিয়ে ধারাবাহিক জনআলোচনা এমন একটি বাস্তবতা তৈরি করেছে, যা শুধু আইনি নয়, কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের দৃষ্টিকোণ থেকেও মূল্যায়নের দাবি রাখে।

বৈশ্বিক মানদণ্ড ও প্যারেন্ট কোম্পানির তদারকি

OECD Principles of Corporate Governance অনুযায়ী, পরিচালনা পর্ষদের দায়িত্ব কেবল আর্থিক ফলাফল নিশ্চিত করা নয়, বরং কার্যকর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, ব্যবস্থাপনার ওপর স্বাধীন তদারকি, জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব রক্ষা করা। একইভাবে OECD Guidelines for Multinational Enterprises on Responsible Business Conduct বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা নির্ধারণ করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, একটি Parent Company-এর দায়িত্ব কেবল নিজস্ব কার্যক্রমে সীমাবদ্ধ নয়। যেখানে তাদের মালিকানা, প্রভাব বা governance oversight রয়েছে, সেখানে সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করা, যথাযথ due diligence পরিচালনা করা এবং তাদের প্রভাব (leverage) ব্যবহার করে সম্ভাব্য নেতিবাচক প্রভাব প্রতিরোধ, প্রশমন বা সমাধানে ভূমিকা রাখার প্রত্যাশা করা হয়। এটি কোনো স্বয়ংক্রিয় আইনি দায় নির্ধারণ করে না; বরং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত দায়িত্বশীল কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের একটি মানদণ্ড।

এই আলোচনায় টেলিনরের ভূমিকাও স্বাভাবিকভাবেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। টেলিনর নরওয়ের একটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান এবং নরওয়ে OECD-এর সদস্যরাষ্ট্র। পাশাপাশি টেলিনর জাতিসংঘের UN Guiding Principles on Business and Human Rights-এর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ Responsible Business Conduct এবং Human Rights Due Diligence বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতির কথাও প্রকাশ্যে উল্লেখ করেছে। ফলে গ্রামীণফোনের মতো সহযোগী প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘস্থায়ী স্টেকহোল্ডার বিরোধ দেখা দিলে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে Parent Company হিসেবে বোর্ড পর্যায়ে বিষয়টি কীভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, governance oversight কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে এবং গঠনমূলক সমাধানের পরিবেশ তৈরিতে তাদের প্রভাব কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এটি আইনি দায় নির্ধারণের প্রশ্ন নয়; এটি আন্তর্জাতিক কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের প্রত্যাশা এবং দায়িত্বশীল নেতৃত্বের প্রশ্ন।

সাংগঠনিক সংস্কৃতি ও 'সাইকোলজিক্যাল সেফটি'

ISO 37000:2021 Governance of Organizations স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে কার্যকর গভর্ন্যান্সের জন্য নৈতিক নেতৃত্ব, জবাবদিহিতা, মানবিক আচরণ এবং প্রতিষ্ঠানের উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সাংগঠনিক সংস্কৃতি অপরিহার্য। বোর্ডের অন্যতম দায়িত্ব হলো এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা, যেখানে সমস্যা গোপন না থেকে যথাসময়ে নেতৃত্বের নজরে আসে। এ প্রসঙ্গে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক Amy Edmondson-এর Psychological Safety বিষয়ক গবেষণা বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তার গবেষণা দেখায়, কর্মীদের নীরবতা সবসময় সন্তুষ্টির প্রতীক নয়। অনেক সময় মানুষ কথা বলে না কারণ তারা মনে করে তাদের মতামত গুরুত্ব পাবে না, অথবা এর নেতিবাচক পরিণতি হতে পারে। আধুনিক গভর্ন্যান্স গবেষণায় কর্মীদের নীরবতাকেও একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক সংকেত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কারণ, যখন মানুষ সমস্যা বলতে ভয় পায়, তখন নেতৃত্ব ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

Frederick Herzberg-এর Two-Factor Theory একই বাস্তবতার আরেকটি দিক তুলে ধরে। বেতন, বোনাস কিংবা আর্থিক সুবিধা কর্মীদের অসন্তোষ কমাতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে আস্থা ও অঙ্গীকার গড়ে তুলতে যথেষ্ট নয়। ন্যায্যতা, স্বচ্ছ পদোন্নতি ব্যবস্থা, স্পষ্ট ক্যারিয়ার উন্নয়নের সুযোগ, দক্ষতার নিরপেক্ষ মূল্যায়ন এবং নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বাসই একটি সুস্থ কর্মপরিবেশের ভিত্তি। এই কারণেই আধুনিক HR Governance এখন শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম নয়; এটি প্রতিষ্ঠানের সামগ্রিক গভর্ন্যান্স কাঠামোর অংশ। আন্তর্জাতিক HR পেশাজীবী প্রতিষ্ঠান CIPD ধারাবাহিকভাবে Employee Voice এবং Speak-Up Culture-এর গুরুত্ব তুলে ধরেছে। কার্যকর HR নেতৃত্বের দায়িত্ব কেবল মানবসম্পদ পরিচালনা নয়; বরং কর্মীদের উদ্বেগ বোর্ডের কাছে পৌঁছে দেওয়া, কার্যকর grievance mechanism নিশ্চিত করা এবং এমন একটি পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে ভিন্নমতকে প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

ঐতিহাসিক শিক্ষা ও গ্রামীণফোনের ভবিষ্যৎ গতিপথ

ইতিহাস দেখায়, প্রতিষ্ঠানের বিপর্যয়ের পেছনে অনেক সময় প্রযুক্তিগত দুর্বলতার চেয়ে সাংগঠনিক সংস্কৃতি ও গভর্ন্যান্স ব্যর্থতা বেশি দায়ী থাকে। Boeing-এর 737 MAX সংকট এবং Nokia-এর বাজার নেতৃত্ব হারানোর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, যখন কার্যকর বোর্ড তদারকি, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, উন্মুক্ত মতবিনিময় এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত গ্রহণে দুর্বলতা তৈরি হয়, তখন তার প্রভাব প্রতিষ্ঠানের সুনাম, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা এবং স্টেকহোল্ডারদের аস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদে পড়তে পারে। অন্যদিকে, টাটা গ্রুপ দীর্ঘদিন ধরে নৈতিক নেতৃত্ব, শক্তিশালী পরিচালনা পর্ষদের তদারকি, মূল্যবোধভিত্তিক ব্যবসায়িক সংস্কৃতি এবং স্টেকহোল্ডারদের প্রতি দায়বদ্ধতার মাধ্যমে টেকসই কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের একটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।

গ্রামীণফোনের বর্তমান প্রেক্ষাপটে মূল প্রশ্নটি তাই শুধু আইনি নয়। প্রশ্ন হলো, এই দীর্ঘস্থায়ী বিরোধ প্রতিষ্ঠানটির কৌশলগত সক্ষমতা, ব্যবস্থাপনার মনোযোগ এবং কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের ওপর কী প্রভাব ফেলছে? যে সময় নতুন উদ্ভাবন, গ্রাহকসেবা, ডিজিটাল রূপান্তর, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক কৌশল নির্ধারণে ব্যয় হওয়ার কথা, তার একটি অংশ কি দীর্ঘদিনের বিরোধ ব্যবস্থাপনায় ব্যয় হচ্ছে? প্রতিটি প্রতিষ্ঠানেরই এমন একটি সময় আসে, যখন সিদ্ধান্ত নিতে হয়—অতীতের অবস্থান রক্ষা করাই কি মূল লক্ষ্য হবে, নাকি আস্থা পুনর্গঠন, সংলাপ, আত্মসমালোচনা এবং দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক সম্পর্ক পুনর্নির্মাণের পথে এগোনো হবে। আধুনিক কর্পোরেট গভর্ন্যান্সের চূড়ান্ত পরীক্ষা আদালতের রায়ে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত পরীক্ষা হয় তখন, যখন একটি প্রতিষ্ঠান সিদ্ধান্ত নেয় যে আইনি অবস্থান রক্ষার পাশাপাশি নৈতিক নেতৃত্ব, কার্যকর বোর্ড তদারকি, স্বচ্ছতা, স্টেকহোল্ডারদের আস্থা এবং দায়িত্বশীল ব্যবসায়িক আচরণকেও সমান গুরুত্ব দেবে।


লেখক: কমিউনিকেশন সেক্রেটারি, গ্রামীণফোন ইমপ্লয়িস ইউনিয়ন (জিপিইইউ)



দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।