১৪ লক্ষাধিক স্ক্যাম অ্যাকাউন্ট বন্ধ

গুঁড়িয়ে দেয়া হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াভিত্তিক বিশাল অনলাইন স্ক্যাম সিন্ডিকেট

গুঁড়িয়ে দেয়া হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াভিত্তিক বিশাল অনলাইন স্ক্যাম সিন্ডিকেট
৪ জুন, ২০২৬ ২০:২৭  

বিশ্বজুড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জালিয়াতি এবং আর্থিক প্রতারণা চক্রের নেটওয়ার্ক ধ্বংস করতে এক অভূতপূর্ব যৌথ অভিযান পরিচালনা করেছে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটা, প্রযুক্তি জায়ান্ট মাইক্রোসফট, শীর্ষ ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ কয়েনবেস, ইলন মাস্কের স্যাটেলাইট ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠান স্টারলিংক (স্পেসএক্স) এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ। আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর সহায়তায় চালানো এই মেগা অপারেশনের মাধ্যমে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়াভিত্তিক একটি বিশাল অনলাইন স্ক্যাম সিন্ডিকেটকে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।

নিজেদের প্ল্যাটফর্মগুলোতে স্ক্যামারদের অবাধে কাজ করতে দেওয়া এবং বিজ্ঞাপন জালিয়াতি থেকে বছরে শত শত কোটি ডলার আয় করার কারণে মেটা দীর্ঘদিন ধরেই তীব্র সমালোচনার মুখে ছিল। তবে এবার তারা আন্তর্জাতিক মহলের সাথে হাত মিলিয়ে বড় ধরনের অ্যাকশনে নেমেছে। এই বিশেষ অভিযানটির মূল লক্ষ্য ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় (যেমন কম্বোডিয়া বা মায়ানমার) গড়ে ওঠা অপরাধী চক্রগুলো, যারা মূলত মার্কিন নাগরিকদের টার্গেট করে ‘রোমান্স স্ক্যাম’, ‘পিগ বুচারিং’ (ক্রিপ্টো বিনিয়োগের নামে প্রতারণা) এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ছদ্মবেশে প্রতারণা করে আসছিল। 

এই চক্রগুলো আবার স্থানীয় এশীয় অঞ্চলের বেকার যুবকদের ভালো চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ধরে নিয়ে যেত এবং নিজেদের সুরক্ষিত স্ক্যাম কম্পাউন্ডে বা বন্দিশালায় দাস হিসেবে রেখে জোরপূর্বক সাইবার জালিয়াতির কাজ করাত।

ওয়াশিংটন ডিসি-তে গোপন বৈঠক ও ‘ডট কানেক্টিং’
গত ১৮ মে থেকে শুরু হওয়া এক বিশেষ সপ্তাহে মেটা, মাইক্রোসফট, কয়েনবেস, স্টারলিংক এবং মার্কিন বিচার বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তারা ওয়াশিংটন ডিসি-তে এক গোপন ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন। এই বৈঠকে থাইল্যান্ডের রয়্যাল থাই পুলিশসহ যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা এবং নিউজিল্যান্ডের আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো অংশ নেয়। বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মের কাছে থাকা বিচ্ছিন্ন সব তথ্য এক জায়গায় এনে অপরাধীদের মূল শিকড় বা ‘ডট কানেক্ট’ করার ক্ষেত্রে এই বৈঠকটি ছিল অত্যন্ত কার্যকর। মেটা জানিয়েছে, বিভিন্ন খাতের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এই ধরনের সমন্বিত ও যৌথ সহযোগিতা প্রযুক্তি দুনিয়ার ইতিহাসে এটিই প্রথম।

কারিগরি ও আইনি অভিযানের বিশাল সাফল্য
এই ঐতিহাসিক যৌথ অভিযানের ফলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রতারকদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও বিশাল সাফল্য পেয়েছে। ফেসবুক এবং ইনস্টাগ্রাম থেকে একযোগে ১৪ লক্ষাধিক (১.৪ মিলিয়ন) জালিয়াতি চক্রের অ্যাকাউন্ট, পেজ এবং গ্রুপ চিহ্নিত করে তা সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় বা ডিলিট করে দিয়েছে। এছাড়া, স্ক্যামারদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এবং জালিয়াতির কাজে ব্যবহৃত প্রায় ২০,০০০ আউটলুক বা মাইক্রোসফট অ্যাকাউন্ট স্থগিত করা হয়েছে।

এই অপরাধী চক্রের সাথে জড়িত এবং ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে হাতিয়ে নেওয়া প্রায় ৩০ লাখ মার্কিন ডলার (৩ মিলিয়ন ডলার) মূল্যের ক্রিপ্টোকারেন্সি বা ডিজিটাল সম্পদ ফ্রিজ বা বাজেয়াপ্ত করেছে কয়েনবেস।

স্টারলিংক দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুর্গম স্ক্যাম সেন্টারগুলোতে ইন্টারনেট সংযোগের জন্য ব্যবহৃত হাজার হাজার স্যাটেলাইট ইন্টারনেট কিট বা টার্মিনাল স্থায়ীভাবে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে।

তথ্য আদান-প্রদানের এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো আরও বেশ কয়েকটি গোপন স্ক্যাম সেন্টারের অবস্থান নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করতে পেরেছে এবং এখন পর্যন্ত এই চক্রের সাথে জড়িত ৬৩ জন মূল সন্দেহভাজন অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জানিয়েছে, ইন্টারনেট দুনিয়াকে সাধারণ মানুষের জন্য নিরাপদ করতে তাদের এই যৌথ লড়াই আগামী দিনগুলোতেও অব্যাহত থাকবে।

মেটার পূর্ববর্তী রেকর্ড ও এআই প্রযুক্তির ব্যবহার
অনলাইন স্ক্যামারদের ঠেকাতে মেটা অবশ্য গত বছর থেকেই তাদের নজরদারি ও আইনি ব্যবস্থা বহুগুণ জোরদার করেছে। গত ২০২৫ সাল জুড়েই মেটা প্রায় ১৫ কোটি ৯০ লাখ (১৫৯ মিলিয়ন) প্রতারণামূলক বিজ্ঞাপন বাজার থেকে সরিয়েছে এবং ১০.৯ মিলিয়ন ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট বন্ধ করেছে। এছাড়া সেলিব্রেটি বা তারকাদের ‘ডিপফেক’ বা নকল ছবি ব্যবহার করে ভুয়া ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপন দেওয়ার অপরাধে মেটা চীন ও ব্রাজিলের বেশ কিছু বিজ্ঞাপনী সংস্থার বিরুদ্ধে সরাসরি মামলাও দায়ের করেছে।

চলতি ২০২৬ সালের মার্চ মাসেই মেটা তাদের সিস্টেমে নতুন এআই টুল চালু করেছে, যা কোনো নামী ব্র্যান্ড বা তারকার ছদ্মবেশ ধারণকারী অ্যাকাউন্টগুলোকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে শনাক্ত করতে পারে। এমনকি কোনো সাধারণ ব্যবহারকারী যদি কোনো সন্দেহভাজন বা প্রতারক অ্যাকাউন্টের সাথে মেসেঞ্জারে কথা বলেন, তবে মেটা এখন রিয়েল-টাইমে ব্যবহারকারীকে অ্যালার্ট বা সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দিচ্ছে। 

প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা বলছেন, ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামের হারানো বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনতে মেটার এই যৌথ মেগা অপারেশন সাইবার অপরাধের ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক হিসেবে গণ্য হবে।

ডিবিটেক/বিএমটি   ।   সূত্র: এনগ্যাজেট