নিরাপত্তা সংস্থার সুপারিশে তৃতীয় সিমে এক সপ্তাহের যাচাই

এক এনআইডিতে ৫ সিমে ঝুঁকিতে ৪ কোটি সংযোগ

  • এক এনআইডিতে ৫ সিম হলে ৪ কোটি সংযোগ বাতিলের ঝুঁকি
  • তৃতীয় সিম নিবন্ধনে বায়োমেট্রিক ও অপরাধতথ্য যাচাইয়ের প্রস্তাব
  • অপারেটরদের মতে, সিম কমালেই ডিজিটাল অপরাধ কমবে না

এক এনআইডিতে ৫ সিমে ঝুঁকিতে ৪ কোটি সংযোগ
২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৯:৫৯  

দেশে সাইবার অপরাধ, অবৈধ ভিওআইপি ও আর্থিক প্রতারণা ঠেকাতে একজন গ্রাহকের এনআইডির বিপরীতে বৈধ সিমের সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমিয়ে আনা হচ্ছে। সর্বশেষ পর্যালোচনায় এক এনআইডিতে সর্বোচ্চ পাঁচটি সিম রাখার সীমা কার্যকরের বিষয়টি সামনে আসায় প্রায় চার কোটি সক্রিয় সিম সংযোগ বাতিলের ঝুঁকিতে পড়েছে।

নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে দুইটির পর তৃতীয় নতুন সিম কেনার ক্ষেত্রে নিবন্ধন সম্পন্ন করতে এক সপ্তাহ পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাচাই-বাছাইয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে।

সূত্রমতে, দুইটির বেশি সিম নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সেন্ট্রাল বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশন মনিটরিং প্লাটফর্ম এবং পুলিশের ক্রাইম ডাটা ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের মাধ্যমে গ্রাহকের তথ্য যাচাইয়ের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।

তবে এই ব্যবস্থা এখনো চূড়ান্ত হয়নি। নিরাপত্তা সংস্থা ও বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) থেকে পাওয়া ফিডব্যাক বিশ্লেষণ করে সবার সুবিধা বিবেচনায় নিয়ে এটি বাস্তবায়ন করা হবে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। জাতীয় নিরাপত্তা ও ব্যক্তির অধিকার—দুই দিকের সমন্বয় করেই এ ক্ষেত্রে উদ্যোগ ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

এদিকে, রাষ্ট্রীয় টেলিকম অপারেটরে নতুন করে সিম নিবন্ধন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে বলে কাস্টমার কেয়ারে ফোন করে জানতে পেরেছেন গ্রাহকরা। তবে বেসরকারি মোবাইল অপারেটরদের সিম নিবন্ধন যথারীতি চলছে। কাস্টমার কেয়ার ছাড়াও রাস্তা-ঘাটে বিভিন্ন এজেন্টের কাছ থেকেও সিম কিনতে পারছেন গ্রাহকরা।

কেন ঝুঁকিতে চার কোটি সিম

দেশে মোট মোবাইল সংযোগের সংখ্যা ১৮ কোটির বেশি হলেও প্রকৃত স্বতন্ত্র এনআইডিধারী ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি ৭৫ লাখের কাছাকাছি।

তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ গ্রাহক পাঁচটি বা তার কম সিম ব্যবহার করেন। তবে অন্তত ১ কোটি ২০ লাখ গ্রাহকের নামে গড়ে ছয় থেকে ১০টি করে সিম নিবন্ধিত রয়েছে।

ফলে সর্বোচ্চ সীমা পাঁচটিতে নামিয়ে আনা হলে ষষ্ঠ থেকে দশম নম্বরের সীমায় থাকা বিপুলসংখ্যক সংযোগ পর্যায়ক্রমে বাতিল করতে হবে। এতে প্রায় ৩ কোটি ৫০ লাখ থেকে চার কোটি সক্রিয় সংযোগ সরাসরি বন্ধ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

যেভাবে কমেছে সিমের সীমা
বাংলাদেশে বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে সিম নিবন্ধন চালুর পর থেকে একজন গ্রাহকের নামে সর্বোচ্চ কতটি সিম রাখা যাবে, সে সীমা একাধিকবার পরিবর্তন করা হয়েছে।

বায়োমেট্রিক সিম নিবন্ধনের শুরুতে একজন গ্রাহকের এনআইডির বিপরীতে সর্বোচ্চ ২০টি সিম রাখার অনুমতি ছিল।

২০১৭ সালে অনিবন্ধিত ও জাল সিমের অপব্যবহার ঠেকাতে বিটিআরসি এই সীমা কমিয়ে এনআইডি প্রতি ১৫টি করে।

এরপর জাতীয় নিরাপত্তা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে ২০২৫ সালে সীমা আরও কমিয়ে সর্বোচ্চ ১০টি করা হয়। এতে অতিরিক্ত প্রায় অর্ধকোটি সিম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিলের প্রক্রিয়ায় পড়ে।

সর্বশেষে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কমিটির মতামত এবং নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের সুপারিশের ভিত্তিতে সীমা আরও কমিয়ে পাঁচটিতে নামিয়ে আনার নীতিগত সিদ্ধান্ত তৈরি হয়েছে। এটি ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

নিরাপত্তা সংস্থার যুক্তি
নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যুক্তি হলো, অপরাধীরা অন্যের এনআইডি অথবা একাধিক সিম ব্যবহার করে আর্থিক প্রতারণা, বিকাশ-নগদ জালিয়াতি ও অপপ্রচার চালায়। এসব ক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যবহারকারীকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।

তাদের মতে, একটি এনআইডির বিপরীতে সিমের সংখ্যা সীমিত করা গেলে ভুয়া অ্যাকাউন্ট ও পরিচয় ব্যবহারের সুযোগ অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।

তবে মোবাইল অপারেটর ও ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের মতে, শুধু সিমের সংখ্যা কমিয়ে ডিজিটাল অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।

বর্তমানে অনেক পরিবারে বয়স্ক ব্যক্তি বা শিশুদের জন্য পরিবারের একজন সদস্যের এনআইডিতে ইন্টারনেট রাউটার, আইওটি ডিভাইস কিংবা ট্যাবের সিম নেওয়া হয়। ফলে এক ধাক্কায় সীমা পাঁচটিতে নামিয়ে আনা হলে সাধারণ গ্রাহক ভোগান্তিতে পড়তে পারেন।

অপারেটরদের ভিন্নমত
সিমের কারণে ডিজিটাল অপরাধ বাড়ছে—এমন বক্তব্যের সঙ্গে একমত নন অপারেটররা।

এ বিষয়ে রবি’র চিফ কর্পোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার সাহেদ আলম বলেন, “এখানে অনেকগুলো বিষয় জড়িত। অনেকগুলো ডেটা পয়েন্ট আছে। তাই আমাদের সঙ্গে বসলেই তারা বিষয়টি সমাধান করা সঠিক হবে। কেননা, আমরা দেখছি যখন সিম সংখ্যা ১৫ থেকে ১০ এ নামানো হয়েছে তারপরও সেভাবে অপরাধ কমেনি। তাই এটা যদি একটিতেও নামিয়ে আনা হয় তারপরও অপরাধ সংঘটিত হবে। অপরাধের জন্য সিমই একমাত্র দায়ী নয়। এই এআই এর সময়ে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও কৌশলী হতে হবে। এনাডি ডেটাবেইজডটা আগে সিকিউর করতে হবে।”

সাহেদ আলমের বক্তব্য অনুযায়ী, অপরাধের সঙ্গে শুধু সিমের সংখ্যা নয়, একাধিক তথ্য ও প্রযুক্তিগত উপাদান জড়িত। তাই সিম সীমিত করার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ডেটাবেইজের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং তথ্যভিত্তিক নজরদারি জোরদার করাও প্রয়োজন।

অতিরিক্ত সিম বাতিল হলে ঝুঁকি
বিটিআরসির নিয়ম অনুযায়ী, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে গ্রাহক নিজে অতিরিক্ত সিম ডি-রেজিস্ট্রার না করলে কমিশন ‘দৈবচয়ন’ বা Random Selection পদ্ধতিতে অতিরিক্ত সিম স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিষ্ক্রিয় করতে পারে।

এতে গ্রাহকের গুরুত্বপূর্ণ ব্যাংকিং, আর্থিক লেনদেন বা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহৃত নম্বরও হঠাৎ বন্ধ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত নম্বর কিংবা বিভিন্ন ডিজিটাল সেবায় ব্যবহৃত সিম বাতিল হলে গ্রাহককে নতুন করে নম্বর পরিবর্তন ও সেবা পুনর্নিবন্ধনের ঝামেলায় পড়তে হতে পারে।

নিজের নামে কত সিম, জানবেন যেভাবে

নিজের এনআইডির বিপরীতে বর্তমানে কয়টি সিম নিবন্ধিত রয়েছে, তা গ্রাহক নিজেই যাচাই করতে পারেন।

মোবাইল ফোন থেকে *16001# ডায়াল করতে হবে। এরপর ফিরতি প্রম্পটে এনআইডির শেষ চারটি ডিজিট লিখে সেন্ড করতে হবে। ফিরতি এসএমএসে কোন কোন অপারেটরের কতটি সিম সংশ্লিষ্ট এনআইডির নামে নিবন্ধিত রয়েছে, তা জানিয়ে দেওয়া হবে।

অপ্রয়োজনীয় সিম থাকলে সংশ্লিষ্ট অপারেটরের গ্রাহকসেবা কেন্দ্রে গিয়ে সেটি ডি-রেজিস্ট্রার করে নেওয়াকে নিরাপদ মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
//ডিবিটেক/ নাফিজা আঞ্জুম/ এসএমই/এমআইএসটি//