স্পেসএক্সকে মাসে ৯২০ মিলিয়ন ডলার দেবে গুগল

স্পেসএক্সকে মাসে ৯২০ মিলিয়ন ডলার দেবে গুগল
৬ জুন, ২০২৬ ২০:১৫  

বিশ্ব শেয়ার বাজারে নিজেদের ঐতিহাসিক আত্মপ্রকাশ বা আইপিওর ঠিক এক সপ্তাহ আগে আরও একটি বিশাল বাণিজ্যিক চুক্তি সম্পন্ন করেছে ইলন মাস্কের মহাকাশ ও এআই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ‘স্পেসএক্স’। টেক জায়ান্ট গুগল তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এজেন্টের ক্রমবর্ধমান চাহিদা সামাল দিতে স্পেসএক্সের কাছ থেকে প্রসেসর ও কম্পিউটেশনাল পাওয়ার ভাড়া নেওয়ার জন্য এই মেগা চুক্তি করেছে। গত শুক্রবার মার্কিন নিয়ন্ত্রক সংস্থার কাছে জমা দেওয়া স্পেসএক্সের একটি নথির বরাতে এই তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

চুক্তির শর্তানুযায়ী, আগামী ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৯ সালের জুন মাস পর্যন্ত গুগল প্রতি মাসে স্পেসএক্সকে ৯২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার (প্রায় ১ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি) পরিশোধ করবে। এর বিনিময়ে গুগল স্পেসএক্সের কাছ থেকে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার সর্বাধুনিক ‘এনভিডিয়া জিপিইউ’, সিপিইউ, মেমোরি এবং অন্যান্য এআই হার্ডওয়্যার পরিকাঠামো ব্যবহারের একক সুবিধা বা অ্যাক্সেস পাবে।

অ্যানথ্রোপিকের পর এবার গুগলের বিগ ডিল
স্পেসএক্সের এই চুক্তিটি গত মে মাসের শেষের দিকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান ‘অ্যানথ্রোপিক’-এর সাথে করা চুক্তির মতোই দীর্ঘমেয়াদি ও সমগোত্রীয়। মে মাসের চুক্তিতে অ্যানথ্রোপিক ২০২৯ সাল পর্যন্ত স্পেসএক্সকে প্রতি মাসে ১.২৫ বিলিয়ন ডলার দিতে সম্মত হয়েছিল, যাতে তারা টেনেসির মেমফিসের কাছে অবস্থিত ‘কলোসাস ১’ ডেটা সেন্টারের সব কম্পিউট পরিকাঠামো ব্যবহার করতে পারে। উল্লেখ্য, এই মেগা ডেটা সেন্টারটি মূলত ইলন মাস্কের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান ‘এক্সএআই’ তাদের নিজেদের এআই প্রশিক্ষণের জন্য তৈরি করেছিল, যা এখন স্পেসএক্সের অংশ।

হিসাব অনুযায়ী, গুগল মূলত অ্যানথ্রোপিকের পাওয়া সুবিধার প্রায় অর্ধেক পরিমাণ কম্পিউট বা জিপিইউ ভাড়া নিচ্ছে। তবে গুগল ঠিক কোন নির্দিষ্ট ডেটা সেন্টারটি ব্যবহার করবে, তা স্পেসএক্স প্রকাশ করেনি। এর আগে ইলন মাস্ক ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, তাদের নির্মাণাধীন ‘কলোসাস ২’ ডেটা সেন্টারটি কেবল এক্সএআই-এর নিজস্ব কাজের জন্য সংরক্ষিত থাকবে।

গুগলের চেনা ছক ও ‘জেমিনি এন্টারপ্রাইজ’-এর জোয়ার
স্পেসএক্সের সাথে চুক্তির আগে অ্যানথ্রোপিকের নিজস্ব কম্পিউট বা সার্ভার ক্ষমতা মারাত্মকভাবে সীমিত ছিল, যার কারণে তারা চুক্তির দিনই তাদের চ্যাটবটের ব্যবহারের সীমা বাড়িয়েছিল। তবে গুগল সম্পূর্ণ ভিন্ন অবস্থানে রয়েছে; কারণ গুগলকে বর্তমানে বিশ্বের একক বৃহত্তম এআই কম্পিউট বা সার্ভার মালিক হিসেবে গণ্য করা হয়। এত বিশাল নিজস্ব পরিকাঠামো থাকার পরও স্পেসএক্সের কাছ থেকে প্রসেসর ভাড়া নেওয়ার কারণ হিসেবে গুগল তাদের সদ্য চালু হওয়া এআই প্রোডাক্টগুলোর অপ্রত্যাশিত ও আকাশচুম্বী চাহিদার কথা উল্লেখ করেছে।

এক বিবৃতিতে গুগলের মুখপাত্র বলেন, “গুগল ক্লাউড এবং স্পেসএক্স দীর্ঘদিনের ব্যবসায়িক অংশীদার। আমাদের নতুন লার্জ এজেন্ট প্ল্যাটফর্ম ‘জেমিনি এন্টারপ্রাইজ’-এর জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে আমরা ধারণার চেয়েও অনেক বেশি সাড়া পেয়েছি। এই বর্ধিত চাহিদার তাৎক্ষণিক চাপ সামাল দিতে অন্তর্বর্তীকালীন সেতু বা ‘ব্রিজ ক্যাপাসিটি’ হিসেবে স্পেসএক্সের সাথে এই সাময়িক চুক্তিটি করা হয়েছে।”

গুগলের মূল মূল প্রতিষ্ঠান ‘অ্যালফাবেট’ বর্তমানে এআই পরিকাঠামো বাড়াতে দেদারসে অর্থ খরচ করছে। তারা ইতিমধ্যেই চলতি বছরে ১৮০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূলধনী ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং ২০২৭ সালে এই খরচ আরও মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পাবে বলে জানিয়েছে। এই বিশাল খরচের তহবিল জোগাড় করতে অ্যালফাবেট সম্প্রতি ৮০ বিলিয়ন ডলারের শেয়ার বিক্রিরও ঘোষণা দিয়েছে।

বাতিলকরণ নীতি ও ট্রিলিয়ন ডলারের আইপিও
অ্যানথ্রোপিক চুক্তির মতো গুগলের এই চুক্তিতেও একটি বিশেষ ‘বাতিলকরণ ধারা’ রাখা হয়েছে। আগামী ৩১ ডিসেম্বর ২০২৬-এর পর থেকে যেকোনো পক্ষ চাইলে মাত্র ৯০ দিনের নোটিশে এই চুক্তি বাতিল করতে পারবে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী, আগামী সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত গুগল একটি বিশেষ ছাড় বা হ্রাসকৃত মূল্যে এই ডেটা সেন্টারে অ্যাক্সেস পেতে শুরু করবে। তবে স্পেসএক্স যদি আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর মধ্যে প্রতিশ্রুত ১ লাখ ১০ হাজার জিপিইউ সরবরাহ করতে ব্যর্থ হয়, তবে এক মাসের গ্রেস পিরিয়ড শেষে গুগল চাইলে চুক্তিটি সম্পূর্ণ বাতিল করতে পারবে কিংবা মাসিক ফি কমিয়ে দিয়ে যতটুকু জিপিইউ পাওয়া গেছে তাতেই সন্তুষ্ট থাকতে পারবে।

স্পেসএক্স এমন এক সময়ে এই মেগা ডিলটি প্রকাশ করল, যখন আগামী সপ্তাহে আমেরিকার ‘নাসডাক’ শেয়ার বাজারে প্রতিষ্ঠানটির স্টক ট্রেডিং বা কেনাবেচা শুরু হতে যাচ্ছে। মার্কিন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের কাছে জমা দেওয়া কাগজপত্র অনুযায়ী, স্পেসএক্স তাদের এই আইপিও-র মাধ্যমে প্রায় ১.৭৫ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার বাজার মূল্যায়নে প্রায় ৭৫ বিলিয়ন ডলারের তহবিল তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যা বিশ্ব করপোরেট ইতিহাসের বৃহত্তম আইপিও হতে যাচ্ছে। 

উল্লেখ্য, গুগল দীর্ঘ সময় ধরে স্পেসএক্সের অন্যতম প্রধান বিনিয়োগকারী এবং এই আইপিও-র পর স্পেসএক্সে গুগলের শেয়ারের আর্থিক মূল্য প্রায় ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে। বর্তমানে এই দুই প্রতিষ্ঠান মহাকাশে ‘অরবিটাল ডেটা সেন্টার’ বা কক্ষপথীয় ডেটা সেন্টার তৈরির বিষয়েও আলোচনা চালাচ্ছে, যা আইপিও-পরবর্তী স্পেসএক্সের অন্যতম প্রধান ভবিষ্যৎ প্রকল্প।

ডিবিটেক/বিএমটি   ।   সূত্র: টেকক্রাঞ্চ