প্রেসারাইজারের কারিগরি জটিলতায় পিছিয়ে যাচ্ছে রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পের বাণিজ্যিক কমিশনিং

রূপপুরের সেফটি ভালভে ত্রুটি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে অনিশ্চয়তা

  • ইউনিট-১-এর প্রেসারাইজারের পাইলট-অপারেটেড রিলিফ ভালভ পরীক্ষায় বারবার ব্যর্থ হওয়ায় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের সময়সূচি নিয়ে সংশয় সৃষ্টি হয়েছে
  • বাণিজ্যিকভাবে বিকল্প না থাকায় ইউনিট-২ থেকে ভালভ স্থানান্তরের প্রস্তাব দিয়েছে রুশ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেএসসি এএসই
    রূপপুরের সেফটি ভালভে ত্রুটি, বিদ্যুৎ উৎপাদনে অনিশ্চয়তা
    ৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:২১  

    রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ইউনিট-১-এর গুরুত্বপূর্ণ সেফটি ভালভে কারিগরি ত্রুটি ধরা পড়ায় জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। ইউনিটটির প্রেসারাইজারে স্থাপিত দুটি পাইলট-অপারেটেড রিলিফ ভালভে (PORV) ত্রুটি চিহ্নিত হওয়ায় পরবর্তী ধাপের পরীক্ষা পরিচালনা করা যাচ্ছে না। ফলে নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হবে কি না, তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে দাবি করা হয়েছে।

    রিঅ্যাক্টরের প্রাইমারি কুলিং সিস্টেমের অতিরিক্ত চাপ নিয়ন্ত্রণে এই ভালভগুলো অত্যন্ত স্পর্শকাতর নিরাপত্তা উপাদান হিসেবে কাজ করে। প্রকৌশল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জেএসসি এএসই (JSC ASE) ইউনিট-১ সচল করতে ইউনিট-২ থেকে একটি ভালভ স্থানান্তরের প্রস্তাব দিয়েছে। প্রকল্প কর্মকর্তারা জানান, বিকল্প ভালভ স্থাপন করা না গেলে বাণিজ্যিক কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে যেতে পারে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ভালভগুলো রূপপুরের নির্দিষ্ট রিঅ্যাক্টর ডিজাইনের জন্য বিশেষভাবে নির্মিত হওয়ায় সাধারণ বাণিজ্যিক বাজার থেকে সংগ্রহ করা অসম্ভব।

    ১৭ আগস্ট, সোমবার ঢাকার বাংলাদেশ সচিবালয়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারকদের সঙ্গে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার খোজিনের এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সরকারি কার্যবিবরণী সূত্রে জানা যায়, ইউনিট-১-এর প্রেসারাইজার ভালভের পরীক্ষা পাঁচ সপ্তাহ ধরে কয়েক দফা ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে ভালভটির প্রধান নকশাবিদ রূপপুর প্রকল্প এলাকায় কাজ করছেন। রুশ প্রকৌশলীদের মতে, অতিরিক্ত নকশাবিদ এনেও দ্রুত ভিন্ন ফল পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই; বরং বিদ্যমান সরঞ্জাম সমন্বয় করাই একমাত্র কার্যকর পথ।

    রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার খোজিন বৈঠকে জানান, সরঞ্জামটি ৫০ থেকে ৬০ বছর কার্যকর থাকার মতো নকশায় তৈরি, তাই দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব, কাঠামোগত শক্তি ও সক্ষমতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সচিব মো. আনোয়ার হোসেন এই অব্যাহত বিলম্বে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে দ্রুত সমস্যা সমাধানের জন্য বাস্তবসম্মত সময়সীমা নির্ধারণের আহ্বান জানান। রুশ পক্ষ কারিগরি মূল্যায়নের জন্য তিন থেকে চার দিন সময় চেয়েছে এবং রাষ্ট্রদূত মস্কোকে বিষয়টি অবহিত করার আশ্বাস দিয়েছেন।

    প্রকল্পের অগ্রগতি সংক্রান্ত তথ্যে জানা গেছে, ইউনিট-১-এর সংশ্লিষ্ট ৫৮টি স্থাপনার মধ্যে ৪৭টি বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক জানিয়েছেন, ইউনিট-১-এর অস্থায়ী হস্তান্তর ডিসেম্বর ২০২৬-এ করার পরিকল্পনা রয়েছে। এদিকে ইউনিট-১-এর সংকটের কারণে ইউনিট-২-এর কাজও পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। পূর্বনির্ধারিত সূচি অনুযায়ী ২০২৭ সালের এপ্রিলে ইউনিট-২-এ পারমাণবিক জ্বালানি লোডিং শুরুর কথা থাকলেও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও প্রস্তুতি এখনো বাকি। এছাড়া ইউনিট-১-এর জন্য বরাদ্দ স্পেয়ার সরঞ্জাম ইউনিট-২-এ ব্যবহৃত হওয়ায় নতুন করে সরঞ্জাম সরবরাহ ও কমিশনিং সম্পন্ন করতে হবে।

    বাংলাদেশ পক্ষ বিলম্বের কারণ চিহ্নিত করতে অতিরিক্ত বিশেষজ্ঞ নিয়োগ এবং স্বাধীন কারিগরি মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছে। রুশ পক্ষ জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে চার্টার্ড ফ্লাইটে আরও বিশেষজ্ঞ এনে ভেন্টিলেশন, এয়ার কন্ডিশনিং ও ইউনিট-২-এর প্রস্তুতি ত্বরান্বিত করা হবে। মূল প্রাক্কলিত ১ লাখ ১৩ হাজার ১০০ কোটি টাকা থেকে বেড়ে প্রকল্পটির সংশোধিত ব্যয় দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩৮ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। রাশিয়ার সঙ্গে জি-টু-জি ভিত্তিতে নির্মিত দেশের প্রথম পরিবেশবান্ধব পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ভবিষ্যৎ এখন এই নিরাপত্তা ভালভের প্রকৌশলগত সফলতার ওপর নির্ভর করছে।
    //ডিবিটেক/আরকেই/এসএমই/এমআইএসটি//