প্রবাসে শিল্পীর ওপর হামলা
ইতালিতে হেনস্তার শিকার বাঁধন
- ভেনিসে পানি, কোক ও ডিম নিক্ষেপ
- ফোন ফেলে, কানের পাশে আঘাত
- পুলিশে অভিযোগ, মামলা করবেন বাঁধন
ইতালির ভেনিসে বাংলাদেশের অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনকে শারীরিকভাবে হেনস্তা ও আক্রমণের অভিযোগ উঠেছে। চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে ইতালিতে থাকা বাঁধনের অভিযোগ, একদল প্রবাসী বাংলাদেশি তাকে লক্ষ্য করে পানি, কোক ও ডিম ছোড়েন, শারীরিকভাবে আঘাত করেন এবং তার মোবাইল ফোন ফেলে দেন। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও বাঁধনের ফেসবুক লাইভের পর ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
স্থানীয় সময় সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর রাতে ভাই ও তার পরিবারের সঙ্গে একটি পার্কে গেলে ঘটনাটি ঘটে বলে জানান বাঁধন। তার দাবি, সেখানে একদল বাঙালি তাকে ঘিরে শারীরিকভাবে হেনস্তা করে। তার শরীরে পানি ও কোক ছুড়ে মারায় তিনি পুরোপুরি ভিজে যান। তার ফোন ফেলে দেওয়া হয় এবং কানের পাশেও আঘাত করা হয়। বাঁধনের ভাইয়ের স্ত্রীকেও ধাক্কা দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লাইভে বাঁধন বলেন, ‘একজন আজমেরী হক বাঁধনকে দমানো এত সহজ হবে না। আপনারা আজ সারা বিশ্বের মানুষকে দেখালেন, বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী একজন অভিনেত্রীকে হেনস্তা করা হলো।’
বাঁধনের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তার সক্রিয় অংশগ্রহণের কারণেই তাকে লক্ষ্য করা হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীদের কয়েকজন নিজেদের আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মী এবং ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ হিসেবে পরিচয় দেন। তারা তাকে ‘জুলাই যোদ্ধা’ বলে উল্লেখ করেন এবং ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলতে চাপ দেন। একই সঙ্গে ঘটনার ভিডিও ধারণ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচার করা হচ্ছিল বলে জানান তিনি।
বাঁধন বলেন, ‘তারা বলেছে যে, আমি জুলাই যোদ্ধা। ইয়েস, আই অ্যাম। আমি অবশ্যই জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা আমার শরীরে হাত তুলেছে, আমার ফোন ফেলে দিয়েছে, আমার কানের পাশে আঘাত করেছে।’
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে একদল ব্যক্তিকে বাঁধনের দিকে পানি ছুড়তে এবং তার সঙ্গে উত্তেজিত অবস্থায় কথা বলতে দেখা যায়। ভিডিওতে এক ব্যক্তিকে নিজেদের ‘ভেনিস ছাত্রলীগ’ এবং ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ পরিচয় দিতে শোনা যায়। ওই ব্যক্তি বাঁধনকে ‘জুলাই জঙ্গি’ ও ‘দেশদ্রোহী’ বলে আখ্যা দিয়ে ডিম আনার কথা বলেন এবং দাবি করেন, তারা তাকে ‘গোসল করিয়ে দিয়েছেন’। একই ভিডিওতে তিনি বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন এবং বলেন, ‘ওরা দেশটা ধ্বংস করছে’।
আরেক পর্যায়ে ওই ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘আমরা ইতালির ছাত্রলীগ! আমরা বঙ্গবন্ধুর সৈনিক! বাংলাদেশের যেকোনো প্রান্তে ওরা যাবে, আমরা তাদের প্রতিহত করব!’ বাঁধনকে উদ্দেশ করে তাকে ‘জুলাই জঙ্গি’ ও ‘ডলারে বিক্রি হয়েছিল’ বলেও মন্তব্য করতে শোনা যায়।
ঘটনার সময় কোলে শিশু নিয়ে এক ব্যক্তি বাঁধনের দিকে এগিয়ে আসা হামলাকারীদের ঠেকানোর চেষ্টা করেন। তার স্ত্রীও ঘটনাস্থলে ছিলেন এবং আক্রমণকারীকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। পরে বাঁধন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এক পোস্টে ওই দম্পতিকে তার ‘কাজিন’ ও তার পরিবার বলে পরিচয় দেন।
ঘটনার পর ফেসবুক লাইভে বাঁধন বলেন, এ ধরনের অসংলগ্ন আচরণ থেকে হামলাকারীদের বেরিয়ে আসা উচিত ছিল। তার মতে, এভাবে কাউকে হেনস্তা করে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান পুনর্গঠন করা সম্ভব হবে না।
তিনি আরও বলেন, ‘আওয়ামী লীগের যেই কর্মীরা জানেন না যে, আমি বাংলাদেশ থেকে যে সিনেমাটা নিয়ে ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভ্যালে আসছি, সেই সিনেমাটার ডিরেক্টর হচ্ছে রুবাইয়াত হোসেন। যার বাবা আপনাদের একজন সম্মানিত মন্ত্রী ছিলেন। আপনারা একটু খবর নিয়ে দেখবেন।’ বাঁধন জানান, রুবাইয়াত হোসেনের সঙ্গে তিনি জুলাই আন্দোলনের পরও কাজ করেছেন।
পরে সাবেক সাংবাদিক নাজমুস সাকিবকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বাঁধন জানান, ঘটনার পর ফোন পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে আসে এবং তাকে থানায় নিয়ে যায়। পরে তাকে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, একজন বাংলাদেশি নাগরিক ও নারী হিসেবে তার ওপর যে হামলা হয়েছে, তার বিচার তিনি ইতালিতে চান।
বাঁধন জানান, তিনি অভিযোগ করবেন এবং মামলা করবেন। ইতালিতে থাকা বাংলাদেশ দূতাবাসকে বিষয়টি জানিয়ে মামলার পরবর্তী কার্যক্রম অনুসরণ করার অনুরোধ করবেন বলেও জানান তিনি। তার ভাষ্য, তিনি ইতালি থেকে চলে যাওয়ার পরও মামলাটি যেন চলমান থাকে এবং অপরাধে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তা নিশ্চিত করতে চান।
ভেনিসে অবস্থানের কারণও চলচ্চিত্রকেন্দ্রিক। রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের অরিজন্তি বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর সালা দারসেনায় চলচ্চিত্রটির প্রদর্শনী হয়। উৎসবের আনুষ্ঠানিক তথ্য অনুযায়ী, এতে অভিনয় করেছেন জাইনীন করিম, রিকিতা নন্দিনী শিমু, সুনেরাহ্ বিনতে কামাল ও আজমেরী হক বাঁধন।
‘রেহানা মরিয়ম নূর’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি পাওয়া বাঁধন ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে প্রকাশ্যে সক্রিয় ছিলেন। ওই সময় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও তিনি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে কথা বলেছেন।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা বাঁধনের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তবে হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। পুলিশের পক্ষ থেকেও স্বাধীনভাবে বিস্তারিত তথ্য নিশ্চিত হওয়ার বিষয়টি এখনো স্পষ্ট নয়।
//ডিবিটেক/এসসিডিআর/ডিএসই/এফওই//





