প্রযুক্তিনির্ভর পুঁজিবাজার গড়ার ঘোষণা বিএসইসির, কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান

প্রযুক্তিনির্ভর পুঁজিবাজার গড়ার ঘোষণা বিএসইসির, কারসাজির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান
৪ জুন, ২০২৬ ১৯:৩৫  

প্রযুক্তিনির্ভর, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক পুঁজিবাজার গড়ে তুলতে নিয়ন্ত্রক কার্যক্রম, বাজার তদারকি, তথ্য প্রকাশ, লাইসেন্সিং এবং বিনিয়োগকারী সেবাকে ধাপে ধাপে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে নিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান মাসুদ খান। একইসঙ্গে বাজার কারসাজি, ইনসাইডার ট্রেডিং, তথ্য ফাঁস ও সিকিউরিটিজ আইন লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় কঠোর আইন প্রয়োগের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি।

৪ জুন, বৃহস্পতিবার বিকেলে বিএসইসির কার্যালয়ে দায়িত্ব গ্রহণের পর আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, দেশের পুঁজিবাজারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্মার্ট নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ডিজিটাইজেশন, ভালো মানের কোম্পানির তালিকাভুক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক ও বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শক্তিশালী তদারকি কাঠামো গড়ে তোলা হবে।

মাসুদ খান বলেন, “আমরা এমন একটি প্রযুক্তিনির্ভর নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চাই, যা হবে দ্রুততর, অধিক স্বচ্ছ, অধিক দক্ষ এবং অংশীজনদের জন্য সহজলভ্য।” তিনি জানান, নিয়ন্ত্রক রিপোর্টিং, তথ্য প্রকাশ, লাইসেন্সিং, অনুমোদন, বাজার পর্যবেক্ষণ এবং বিনিয়োগকারী সেবা পুরোপুরি ডিজিটাল ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, গত কয়েক বছরে দেশের পুঁজিবাজার নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। এর ফলে বিনিয়োগকারীদের আস্থা কমেছে, ভালো কোম্পানিগুলো বাজারে আসতে অনাগ্রহী হয়েছে এবং বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণও হ্রাস পেয়েছে। অনেক বিনিয়োগকারী ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন এবং মিউচুয়াল ফান্ড খাতও প্রত্যাশিত আস্থা অর্জন করতে পারেনি।

নবনিযুক্ত চেয়ারম্যান জানান, কমিশনের লক্ষ্য হলো বাংলাদেশের পুঁজিবাজারকে খুচরা বিনিয়োগকারীনির্ভর ফ্রন্টিয়ার মার্কেট থেকে একটি স্বচ্ছ, বিশ্বাসযোগ্য এবং প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীনির্ভর এমার্জিং মার্কেটে রূপান্তর করা।

তিনি বলেন, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ ব্যবসার ব্যয় বাড়ায় এবং বাজারের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তাই বিদ্যমান বিধিমালা, রিপোর্টিং প্রয়োজনীয়তা এবং অনুমোদন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা করে ঝুঁকিভিত্তিক ও নীতিনির্ভর নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা হবে। “যেখানে প্রয়োজন সেখানে নিয়ন্ত্রণ, আর যেখানে সম্ভব সেখানে সরলীকরণ”—এ নীতিতেই কমিশন এগোবে বলে জানান তিনি।

পুঁজিবাজারে ভালো মানের তালিকাভুক্ত কোম্পানির ঘাটতির কথা উল্লেখ করে মাসুদ খান বলেন, দেশের বহুজাতিক, রাষ্ট্রায়ত্ত এবং বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাজারে আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি যোগ্য কোম্পানির জন্য ডাইরেক্ট লিস্টিংয়ের সুযোগ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে।

বাজার তদারকির বিষয়ে তিনি বলেন, বিএসইসি, ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই), চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জ (সিএসই) এবং সেন্ট্রাল ডিপোজিটরি বাংলাদেশ লিমিটেড (সিডিবিএল)-এর সমন্বয়ে আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক নজরদারি কাঠামো গড়ে তোলা হবে। এর মাধ্যমে ইনসাইডার ট্রেডিং, ওয়াশ ট্রেড, সার্কুলার ট্রেডিং, পাম্প-অ্যান্ড-ডাম্প স্কিম এবং অন্যান্য কারসাজিমূলক কর্মকাণ্ড দ্রুত শনাক্ত ও দমন করা সম্ভব হবে।

তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “আমাদের উদ্দেশ্য মূল্য নিয়ন্ত্রণ করা নয়, বরং ন্যায্যমূল্য নির্ধারণ ও তথ্যের সমান প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা। মূল্য নির্ধারণ করবে বাজার, কারসাজি নয়।”

সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরও জানান, দীর্ঘমেয়াদে ফ্লোর প্রাইস কোনো কার্যকর বাজার ব্যবস্থা নয়। ফলে ভবিষ্যতে নতুন করে কোনো ফ্লোর প্রাইস আরোপ করা হবে না এবং বিদ্যমান ফ্লোর প্রাইসও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় ধাপে ধাপে প্রত্যাহার করা হবে।

বিএসইসি চেয়ারম্যান বলেন, আস্থা ফিরিয়ে আনতে শুধু নীতিগত ঘোষণা যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন স্বচ্ছতা, ন্যায়পরায়ণতা, ধারাবাহিকতা এবং জবাবদিহিতা। “আস্থা বক্তৃতার মাধ্যমে তৈরি হয় না, প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমেও নয়। আস্থা আসে কার্যকর সুশাসন ও ন্যায়সঙ্গত ব্যবস্থাপনা থেকে,” বলেন তিনি।

/ডিবিটেক/জেনও/ইকে/